সিগারেটের মূল্য নির্ধারণে বাস্তবতা ও সরকারি ঘোষণার মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির কারণে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে সরকার। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এক সমীক্ষায় এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে তামাক খাতের করনীতি ও সংস্কার নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইহতিসাম হাসান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার নিম্নস্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দামে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা পর্যায়ে প্রতি শলাকা সিগারেট ৬ টাকা ২০ পয়সার পরিবর্তে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে মধ্যম স্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রেও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
গবেষকদের মতে, সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও বাজারমূল্যের এই ব্যবধানের কারণে কর ও শুল্ক আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। শুধু নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট বাজারেই এ কারণে প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে মূল্য ও কর কাঠামো নির্ধারণ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তাঁর মতে, কাগজে-কলমে নির্ধারিত মূল্য এবং বাস্তব বাজারদরের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিই রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম কারণ। এই অসঙ্গতি দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ই-সিগারেট ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারের বর্তমান নীতিতেও বেশ কিছু দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা এবং কিছু পণ্যের বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে তরুণদের মধ্যে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
রাজস্ব ক্ষতি কমাতে এবং বাজার বাস্তবতার সঙ্গে কর কাঠামোর সামঞ্জস্য আনতে নিম্নস্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য ৬২ টাকার পরিবর্তে ৭০ টাকা এবং মধ্যম স্তরের প্যাকেটের মূল্য ৯২ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে পিপিআরসি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাফিউন এন শিমুল এবং এস এম আবদুল্লাহও বক্তব্য দেন। তারা তামাক খাতে করনীতি সংস্কার, মূল্য কাঠামোর স্বচ্ছতা এবং রাজস্ব আহরণে কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সিগারেটের মূল্য নির্ধারণে বাস্তব বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আদায় ব্যাহত হবে, অন্যদিকে করনীতি কাঙ্ক্ষিত জনস্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জনেও ব্যর্থ হতে পারে। ফলে মূল্য, কর ও বাজার তদারকির মধ্যে সমন্বিত নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

