বিশ্বের জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে এখন অন্যতম শক্তিশালী নাম বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার শিল্প শুধু দেশের ইস্পাত খাতের প্রধান জোগানদাতা নয়, বরং বছরে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বের পুরোনো জাহাজ পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমের ৪৫ শতাংশেরও বেশি বর্তমানে বাংলাদেশে সম্পন্ন হয়। ফলে একক দেশ হিসেবে বৈশ্বিক শিপব্রেকিং শিল্পে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান মিলে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার করলেও এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশীদার বাংলাদেশ।
চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ও সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প কয়েক দশকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। ১৯৬৫ সালে যাত্রা শুরু করা শিল্পটি বর্তমানে ইস্পাত, নির্মাণ, প্রকৌশল ও পুনর্ব্যবহার অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অবসরে যাওয়া শত শত জাহাজ বাংলাদেশের উপকূলে আসে। এসব জাহাজ ভেঙে পাওয়া ইস্পাত, লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম ও অন্যান্য ধাতব উপাদান দেশের শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে একদিকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও কমছে।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইস্পাত শিল্পে বছরে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন স্ক্র্যাপ স্টিল সরবরাহ করে শিপব্রেকিং শিল্প। দেশের মোট ইস্পাত চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি পূরণ হয় এই উৎস থেকে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে এই শিল্প থেকে।
অর্থনীতিতে এর অবদান শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে এই খাতে সরাসরি প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পের সঙ্গে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থায়ও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি। বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন উপকূল, অনুকূল জোয়ার-ভাটার পরিবেশ, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এসব সুবিধার কারণে সীতাকুণ্ডে গড়ে উঠেছে শতাধিক শিপইয়ার্ড।
বর্তমানে সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে ১২৪টি শিপইয়ার্ড কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা গেলে উৎপাদনশীলতা ও আয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরিবেশ দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়গুলো এখনও উদ্বেগের কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এ শিল্পের আয় বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে আরও বড় অবদান রাখা যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাহাজ ভাঙা শিল্পকে শুধু পুরোনো জাহাজ পুনর্ব্যবহারের খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন দেশের ব্লু ইকোনমি, ইস্পাত শিল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পুনর্ব্যবহারভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দশকগুলোতে এই শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।

