ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব সব রপ্তানিকারক দেশের ওপর পড়লেও বাংলাদেশে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। রপ্তানি আয়, রপ্তানির পরিমাণ এবং পণ্যের গড় মূল্য—তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পতন হওয়ায় ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় প্রায় ১৯ শতাংশের বেশি কমেছে। তিন মাসে রপ্তানি আয় ৫৬৮ কোটি ৭১ লাখ ইউরো থেকে নেমে এসেছে ৪৫৯ কোটি ১৬ লাখ ইউরোতে। একই সময়ে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের কমেছে মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি। ফলে প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের পতন অনেক বেশি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
শুধু আয় নয়, পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য প্রায় ১২ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৮৪ ইউরোতে নেমে এসেছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম একই সময়ে আরও বেশি দামে পোশাক বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশটি উচ্চমূল্যের এবং অধিক মূল্য সংযোজনযুক্ত পণ্যের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করায় তাদের রপ্তানি মূল্যে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
রপ্তানির পরিমাণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ কমেছে। অথচ একই সময়ে চীনের পতন ছিল অনেক কম। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু দাম কমিয়ে নয়, বিক্রির পরিমাণেও চাপের মুখে রয়েছে দেশের পোশাক শিল্প।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ইউরোপের ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাজারকে দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ইউরোপমুখী হওয়ায় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। ফলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে সরবরাহকারীদের মধ্যে মূল্য কমানোর প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে ইউরোপীয় বাজারে টিকে থাকতে শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, দ্রুত সরবরাহ, উদ্ভাবনী নকশা এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও কিছু প্রতিযোগী দেশ বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
পোশাক খাতের নেতারা মনে করেন, বৈশ্বিক সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং খুচরা বাজারে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রভাব সরাসরি রপ্তানিতে পড়েছে। পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তা, কর সুবিধা এবং প্রণোদনা পেলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা সেই মাত্রার সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৭৩৬ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় প্রায় ৬৪ কোটি ডলার কম।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থবছরের শুরুতে রপ্তানি পরিস্থিতি বেশি দুর্বল থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাতকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। শুধু বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ব্র্যান্ডভিত্তিক বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ভবিষ্যতে আরও বড় প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।

