চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য স্থায়ী বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে দেশের রপ্তানি আয় কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, আসন্ন উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক যোগাযোগ শুধু বিনিয়োগ বা ঋণনির্ভর সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, দক্ষ জনশক্তি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেছেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে হলে উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ ব্যবহারে আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে দেশের খনিজভিত্তিক শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তিনি মনে করেন, দেশে ন্যানো ফাইবার উৎপাদন শিল্প, চীনা চিকিৎসা পদ্ধতিভিত্তিক বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে একাধিক পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মতো উদ্যোগ দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প খাতের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্য ঘাটতি। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পণ্য চীন থেকে আমদানি করলেও রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই ঘাটতি কমাতে তিনি চীনের বিভিন্ন শহরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে অন্তত ৩০টি স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব আউটলেটে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, সিরামিক সামগ্রী এবং হালকা প্রকৌশল খাতের বিভিন্ন পণ্য বিক্রির সুযোগ রাখা যেতে পারে।
তার দাবি, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ অতিরিক্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীনের বাজারে রপ্তানি করতে সক্ষম হবে। এর ফলে শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়বে না, বরং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ভারসাম্যও উন্নত হবে।
ব্যবসায়ী নেতারা আরও মনে করেন, বাংলাদেশে একটি চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করলে বিনিয়োগ, অর্থায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক লেনদেন আরও সহজ হবে। এতে উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সেবা গ্রহণ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।
চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসনির্ভর বড় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আগে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পর উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী সাত থেকে আট বছরের শিল্প চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। কোন খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কোথায় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে এবং ভবিষ্যতের শিল্পায়নের রূপরেখা কী হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বড় বিনিয়োগ টেকসই ফল দেবে না।
চীন থেকে শিল্প স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, পোশাক খাতের বড় অংশের স্থানান্তর ইতোমধ্যে ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশে চলে গেছে। ফলে শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশকে নতুন শিল্প খাতে মনোযোগ দিতে হবে।
তাদের মতে, ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, হালকা প্রকৌশল, আধুনিক উৎপাদনশিল্প এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে বাংলাদেশের শিল্প খাত আরও বহুমুখী হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, প্রযুক্তি অর্জন এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে এবং বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাত দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য সুবিধা অর্জন করতে পারবে।

