দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এক সময়ের সফল উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত সোলার হোম সিস্টেম প্রকল্প এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে স্থাপিত প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের অর্ধেকেরও বেশি বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত এক বাজেট-পরবর্তী সেমিনারে উপস্থাপিত ‘এসএইচএস সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেমগুলোর প্রায় ৩০ লাখ এখন ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। গবেষকদের মতে, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণের সঙ্গে সোলার ব্যবস্থার সমন্বয় না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, ২০০৩ সালে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে পরিচালিত এই উদ্যোগ গ্রামীণ বিদ্যুতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক পর্যায়ে কর্মসূচিটি ব্যাপক সাফল্যও পায়। ২০১৩ সালে রেকর্ডসংখ্যক ৮ লাখ ৫৩ হাজার সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে জাতীয় গ্রিড দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু হলে সোলার ব্যবস্থার চাহিদা কমতে থাকে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রিড সংযোগ পৌঁছে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক সোলার ব্যবস্থার পরিবর্তে সরাসরি জাতীয় বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অধিকাংশ সোলার হোম সিস্টেমের সক্ষমতা সীমিত ছিল। এগুলো মূলত কয়েকটি বাতি জ্বালানো বা মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার মতো প্রয়োজন মেটাতে পারত। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ঘরের নানা বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোর সুযোগ থাকায় গ্রাহকদের আগ্রহ দ্রুত সেদিকে চলে যায়।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, মাঠপর্যায়ে সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব ছিল। একদিকে গ্রাহকদের কাছে সোলার সিস্টেম বিক্রি ও ঋণ বিতরণ চলছিল, অন্যদিকে একই এলাকায় পূর্বঘোষণা ছাড়াই জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ করা হচ্ছিল। ফলে অনেক সোলার সিস্টেম অল্প সময়ের মধ্যেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
বর্তমানে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক পরিত্যক্ত ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে ভবিষ্যতে পরিবেশ দূষণের নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, এক সময় সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে স্থাপিত সিস্টেমগুলোর প্রায় ৪৭ শতাংশ অচল অবস্থায় রয়েছে। জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে এসব সিস্টেম যুক্ত করার মতো কার্যকর নীতিমালা বা রূপান্তর কৌশলও গড়ে ওঠেনি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার, আবাসিক পর্যায়ে নেট মিটারিং ব্যবস্থা আরও সহজ ও ডিজিটাল করা, সোলার প্রকল্পে ব্যাংক অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং সোলার সম্পদকে জামানত হিসেবে গ্রহণের আইনি কাঠামো তৈরি করা।
এ ছাড়া কৃষি সেচে ব্যবহৃত সোলার পাম্পকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি, ডিজেলনির্ভর সেচে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সমন্বয় কাঠামো গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, পুরোনো ও অচল সোলার সিস্টেমগুলো পুরোপুরি বাতিল না করে সেগুলোকে আধুনিক হাইব্রিড বা গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গেলে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত আবারও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অতীতের পরিকল্পনাগত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করাও জরুরি।

