নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সামনে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস হতে পারে বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তাদের মতে, নীতিগত বাধা দূর করা, কর-শুল্ক কমানো এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক বিস্তার ঘটানো সম্ভব।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সংলাপে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সংলাপে বক্তারা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নেও গতি আনতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কৃষি খাতসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, সরকারি ভবনগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তব শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান অল্প কয়েক বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের বিস্ময়কর সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে আসছে। জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক শক্তি এবং নবায়নযোগ্য উৎস মিলিয়ে দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে।
‘সোলার রাশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পাকিস্তানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ বাসিত ঘৌরি বলেন, বাংলাদেশ এখন সৌরবিদ্যুৎ রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অতীতে অফ-গ্রিড সৌর হোম সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছিল। এখন সময় এসেছে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বৃহৎ পরিসরে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটানোর।
তার উপস্থাপনায় উঠে আসে, ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে প্রায় ১৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াট সৌর প্যানেল আমদানি হয়েছে, যা দেশটির প্রচলিত গ্রিড সক্ষমতার তুলনায়ও বেশি। বর্তমানে সেখানে আনুমানিক ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে। এর প্রায় সবই বিতরণভিত্তিক বা ভোক্তা পর্যায়ের স্থাপনা।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, ঘন ঘন সরবরাহ সংকট এবং বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা পাকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌর প্যানেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়াও এ খাতকে ত্বরান্বিত করেছে।
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ, যা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বেড়ে ৭৩ লাখে পৌঁছেছে। এর বেশিরভাগই গ্রামীণ অঞ্চলের পরিবার। সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের প্রায় পুরো অংশই সাধারণ ভোক্তারা নিজেরা করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সৌরবিদ্যুতের প্রসারের ফলে পাকিস্তান শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়নি, বরং কার্বন নিঃসরণ কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয় হ্রাসের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সুফল পেয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি তেল ও গ্যাস আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর উচ্চ কর ও শুল্ককে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বক্তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ও করের বোঝা বিনিয়োগ ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সিপিডির গবেষক আতিকুজ্জামান সাজিদ বলেন, বাংলাদেশের সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচি একসময় বিশ্বের বৃহত্তম অফ-গ্রিড বিদ্যুতায়ন উদ্যোগগুলোর একটি ছিল। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছিল। তবে জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণের পর এ খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৫১টি নেট-মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা রয়েছে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৫৩১টি নতুন স্থাপনা যুক্ত হয়েছে, যা এ খাতের প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সহজ ঋণের অভাব, নেট মিটারিং অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং উচ্চ কর কাঠামো সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। এসব সমস্যা সমাধান ছাড়া প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর-সুবিধা দিয়েছে। একই সঙ্গে সেচ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে সৌরশক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সঠিক নীতি, সহজ অর্থায়ন এবং বাজারভিত্তিক প্রণোদনা থাকলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই সৌরশক্তি একটি দেশের জ্বালানি খাতের চিত্র বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

