বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল বাবদ ৪১৩ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে একক অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক ঋণনির্ভরতা এবং কয়েক বছর আগে নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ দ্রুত বাড়ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও ঋণদাতা দেশকে মোট ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ গুনতে হয়েছে প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার।
বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই পরিমাণ ইতোমধ্যে আগের অর্থবছরের পুরো বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশকে সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪০৯ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল। তার আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। ফলে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধের বোঝা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, অর্থবছরের শেষ মাসের পরিশোধ যোগ হলে চলতি বছরে বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারে। এমন হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ বার্ষিক রেকর্ড।
অন্যদিকে একই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে পাওয়া গেছে প্রায় ৪১৪ কোটি ডলার এবং অনুদান হিসেবে এসেছে ৪৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ নতুন অর্থপ্রবাহ এলেও তার বড় অংশই প্রায় সমান তালে পুরোনো ঋণের দায় মেটাতে ব্যয় হচ্ছে।
ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশীদার ছিল বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি ১১ মাসে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার ছাড় করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, যারা দিয়েছে প্রায় ৯৩ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যার ঋণ ছাড়ের পরিমাণ ৭৮ কোটি ডলার। চীন ৫৩ কোটি ডলার, ভারত ২৫ কোটি ডলার এবং জাপান প্রায় ৪৩ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
তবে নতুন উদ্বেগের বিষয় হলো বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়া। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশ নতুন ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ৪২২ কোটি ডলার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। অর্থাৎ নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি কমার পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অন্যান্য বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে।
তাদের মতে, ঋণ নেওয়া নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়। যদি প্রকল্পগুলো থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। তবে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। অন্যথায় আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বোঝা আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধই নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ শোধের ঘটনা ভবিষ্যৎ ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

