দেশের শিল্প খাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলছে কারখানা বন্ধের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর বড় অংশই কাজের অভাব এবং আর্থিক সংকটের কারণে টিকে থাকতে পারেনি।
শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার প্রায় ৮৬ শতাংশের পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ—পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ না পাওয়া এবং মালিকপক্ষের আর্থিক দুর্বলতা। এর মধ্যে ২০৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে অর্ডার সংকটে, আর ১৯০টি কারখানা কার্যক্রম গুটিয়েছে মূলধন ও নগদ অর্থের সংকটের কারণে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু শ্রমিক অসন্তোষ, কিছু ব্যাংকিং জটিলতা, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের অভাব কিংবা অন্যান্য কারণে বন্ধ হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুরের একটি বড় পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার ফলে দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট ১০ হাজারের বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে গাজীপুর ও আশুলিয়া অঞ্চলে। গাজীপুরে বন্ধ হয়েছে ১৫৫টি এবং আশুলিয়ায় ১২৪টি কারখানা। এছাড়া চট্টগ্রামে ১১৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৮টি, ময়মনসিংহে ৮টি, কুমিল্লায় ৭টি এবং খুলনায় ৬টি কারখানা স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করেছে। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক এই চিত্র দেশের উৎপাদন খাতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্প। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই দুই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বৈদেশিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, ক্রেতাদের অর্ডার সংকোচন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারছে না।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। করোনা-পরবর্তী ধাক্কা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা রপ্তানিনির্ভর শিল্প খাতকে চাপে ফেলেছে। একই সময়ে দেশে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কারখানার সংকট শুরু হয়েছিল ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। পরে সেই সংকট নগদ অর্থের ঘাটতিতে রূপ নেয়। পর্যাপ্ত কার্যকর মূলধন না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানি করতে পারেনি, সময়মতো উৎপাদন চালাতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
শিল্প পুলিশ বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ শ্রম আইনের বিধান অনুসরণ করেই কারখানা বন্ধের নোটিশ দিয়েছে। তবে সমস্যার মূল জায়গা হচ্ছে শ্রমিকদের বেতন, ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য পাওনা পরিশোধে বিলম্ব। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনকে মধ্যস্থতা করতে হচ্ছে।
শিল্প খাতের ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, সব বন্ধ কারখানাকে একইভাবে মূল্যায়ন করা উচিত হবে না। কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকলেও অনেক কারখানা সাময়িক সংকটে পড়েছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে তাদের একটি অংশ পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারে।
এ কারণে সরকার ইতোমধ্যে বিপদগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শতাধিক নয়, কয়েকশ কারখানা পুনরুজ্জীবনের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবসম্মতভাবে পুনরায় সচল হতে পারবে, তা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন। যেসব কারখানার বাজার সম্ভাবনা, উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক ভিত্তি এখনও রয়েছে, তাদের পুনরুদ্ধারে সহায়তা দেওয়া কার্যকর হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিত সহায়তা দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে শিল্প খাতের বর্তমান সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় বন্ধ কারখানার সংখ্যা আরও বাড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
তাদের মতে, শিল্প খাত দেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকট হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ উৎসাহিত করা না গেলে শিল্প খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
শিল্প খাতের এই সংকট শুধু কারখানা মালিকদের নয়, হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ফলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

