দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি ঘাটতি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরাপদ ও সফলভাবে চালু করতে মূল প্রকল্প এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি সহায়ক প্রকল্পের মধ্যে দ্রুত সমন্বয়, জনবল পরিকল্পনা এবং ক্রয় কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের পর প্রস্তুত করা এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আইএমইডি এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। প্রতিবেদনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭৪ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম সরবরাহ, ক্রয় পরিকল্পনা এবং সহায়ক অবকাঠামো প্রস্তুতিতে এখনও বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের দুটি ইউনিট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য মোট ২ হাজার ৯০ জন জনবল প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান জনবল কাঠামোয় অগ্নিনির্বাপণ ইউনিট, নিরাপত্তা ও শারীরিক সুরক্ষা বিভাগ এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা বিভাগের কর্মী অন্তর্ভুক্ত নেই।
এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৭৩৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৩৬ জন প্রযুক্তিগত কর্মী। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ১ হাজার ২৯০ জন রুশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং ১ হাজার ১৫৫ জনকে নির্ধারিত দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য আরও সুসংগঠিত জনবল পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে আইএমইডি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রধান রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চুক্তি অনুযায়ী বিস্তারিত বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা নিয়মিত সরবরাহ করেনি। ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি, সরঞ্জাম সংগ্রহ, নির্মাণ কার্যক্রম এবং প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপ কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে দ্রুত একটি সময়ভিত্তিক জনবল, ক্রয় ও সরঞ্জাম সরবরাহ পরিকল্পনা সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে ইতোমধ্যে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে এবং সেটি কমিশনিংয়ের উন্নত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। তবে আগের বিভিন্ন ধাপে বিলম্বের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর মূল লক্ষ্য সময়সূচি পিছিয়ে গেছে।
মূল প্রকল্পের পাশাপাশি চারটি সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে রয়েছে বাহ্যিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো, শারীরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৪০ শতাংশ থেকে ৮২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। আইএমইডির মতে, সহায়ক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে অসম গতি ভবিষ্যতে কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা নিরীক্ষা আপত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ২৩০টি নিরীক্ষা আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এখনও কোনো আপত্তির পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়নি। এ অবস্থায় আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দ্রুত এসব আপত্তি নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়েছে আইএমইডি।
সংস্থাটি প্রকল্প পরিচালকের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে তিনি রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক জনবল মোতায়েন পরিকল্পনা, ক্রয় পরিকল্পনা এবং সরঞ্জাম সরবরাহ সূচি প্রস্তুত করেন। একই সঙ্গে মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এবং সহায়ক প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে আগামী এক মাসের মধ্যে সুপারিশ বাস্তবায়নে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে আইএমইডিকে জানাতে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। তাই নির্মাণকাজের অগ্রগতির পাশাপাশি দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সহায়ক অবকাঠামো এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় প্রকল্পটি চালুর পর কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

