বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা চাপের মধ্যেও ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের নতুন নজির গড়ছে। আয় বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কনটেইনার ও পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, সেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সময়োপযোগী নীতিমালা গ্রহণের ফলেই এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৪৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ে বন্দরের আয় ছিল ৪ হাজার ৯৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পরবর্তী অর্থবছরের একই সময়ে সেই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২২ শতাংশেরও বেশি।
একই সময়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কর পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর নিট রাজস্ব উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।
গত পাঁচ বছরের আর্থিক তথ্যও বন্দরের ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ওই সময়ে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত অর্জন করেছিল বন্দরটি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে কঠোর নীতি গ্রহণের ফলে গত দুই বছরে ব্যয় বৃদ্ধির হার এক অঙ্কের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১০ দশমিক ১৮ শতাংশ।
সরকারি কোষাগারেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে কর বাবদ জমা হয়েছে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, মূল্য সংযোজন কর হিসেবে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা।
শুধু আর্থিক সূচক নয়, পরিচালন কার্যক্রমেও নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে কনটেইনার, পণ্য ও জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে বন্দরটি। ২০২৫ সালে বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএসে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউএস। এক বছরে কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউএস এবং প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।
একই সময়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টনে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার ১৪ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি পেয়েছে। জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ মোট ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ পরিচালনা করেছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৫৭টি। ফলে জাহাজ পরিচালনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাহাজ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির কারণেই এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে একাধিক দিন বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান সময় শূন্যে নেমে আসে, যা পরিচালন দক্ষতার বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে সেখানে কনটেইনার পরিচালনা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতাও বেড়েছে। পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বাল্ক কার্গো। এই খাতে এক বছরে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। স্বচ্ছতা ও সেবা সহজ করতে বন্দরে চালু করা হয়েছে অনলাইন ই-মুট পাস, অনলাইন বিল প্রস্তুতকরণ এবং ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা। এর সুফলও দৃশ্যমান। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যু করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমসের কলম বিরতি, বিভিন্ন ধর্মঘট এবং দেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে নানা ধরনের সরবরাহ ও পরিবহনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। তবে উন্নত পরিচালন সক্ষমতার কারণে সেসব পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও অগ্রগতি অর্জন করেছে বন্দরটি। যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলরক্ষী বাহিনীর পরিদর্শনে ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়ার মাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে।
অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৭০ হাজার বর্গমিটার নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ এবং আধুনিক হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, শক্তিশালী নেতৃত্ব, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। জাহাজের অবস্থানকাল কমানো, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, টার্মিনালের উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের কারণে পণ্য ও কনটেইনার পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে জাহাজজট কমেছে। একই সঙ্গে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ বন্দরের কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট, টার্মিনাল অপারেটর এবং পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও সেবার মানে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।

