বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে এই খাত এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। দেশে প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রিহুইলার চলাচল করলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিতে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা মাত্র ৬৬৯।
ফলে একদিকে বাস্তব ব্যবহার, অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামোর অভাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট, মানসম্মত নীতিমালার ঘাটতি এবং বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনাময় এই শিল্প কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না।
শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়। সরকার কর ও শুল্ক সুবিধাসহ কিছু নীতিগত উদ্যোগ নিলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের সড়কে কয়েক মিলিয়ন বৈদ্যুতিক থ্রিহুইলার চললেও আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৬৬৯। তাঁর মতে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে সম্ভাবনাময় এই খাত এখনো প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত।
তিনি আরও বলেন, সারাদেশে পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি, প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে চার্জিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পের উন্নয়ন বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প এবং পরিবেশ—এই চারটি খাতের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব হবে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সেল গঠনেরও প্রয়োজন রয়েছে।
শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পের জন্য একটি নীতিমালার খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে খুব শিগগিরই একটি যুগোপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেমিনারে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) পরিচালক মো. আমিনুর রহমান বলেন, দেশে এখন পর্যন্ত ৩২টি বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯টি স্টেশন চালু রয়েছে। তিনি বলেন, চার্জিং অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারির মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং পরিবেশ দূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে শব্দদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। চার্জিং অবকাঠামো বিস্তার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সহজ অর্থায়নের সুযোগ, সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মতো বিষয়গুলোতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা গেলে আগামী কয়েক বছরে বৈদ্যুতিক যানবাহন বাংলাদেশের পরিবহন খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

