ফুটবলের উন্মাদনায় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিনের। বিশ্বকাপ এলেই এই দুই দেশের পতাকা, জার্সি আর সমর্থকদের উৎসবে মুখর হয়ে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা।
তবে অর্থনীতির মাঠে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ব্রাজিলের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী। রপ্তানি, আমদানি এবং মোট বাণিজ্যের পরিমাণ—সব দিক থেকেই আর্জেন্টিনাকে বড় ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে দেশটি। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক, তবুও সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিচারে ব্রাজিলই বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য। একই সময়ে আর্জেন্টিনায় রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২ কোটি ১৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয়ে ব্রাজিলের বাজার আর্জেন্টিনার তুলনায় প্রায় সাড়ে আট গুণ বড়। এই পরিসংখ্যান শুধু বাজারের আকারই নয়, বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি ব্রাজিলের চাহিদাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১১৩ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে আর্জেন্টিনায় রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২১৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রাজিল এখনো সবচেয়ে বড় বাজার হলেও প্রবৃদ্ধির হারে এগিয়ে রয়েছে আর্জেন্টিনা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।
দুই দেশের বাজারেই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। তবে ব্রাজিলে রপ্তানি হওয়া পণ্যের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। দেশটিতে নিট ও ওভেন পোশাকের পাশাপাশি কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী, জুতা, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, ওষুধ, খেলনা, তামাক, চীনামাটির তৈজসপত্র এবং লোহা-ইস্পাতের তৈরি বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীও পাঠানো হচ্ছে। ফলে একটি খাতের ওপর নির্ভর না করে ধীরে ধীরে বহুমুখী রপ্তানি বাজার হিসেবে ব্রাজিলের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।
আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এখনো তৈরি পোশাকই রপ্তানির মূল ভিত্তি। মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিকজাত পণ্য, খেলনা এবং চীনামাটির তৈরি কিছু সামগ্রী সেখানে রপ্তানি হচ্ছে। তবে পণ্যের বৈচিত্র্য ও বাজারের গভীরতার দিক থেকে আর্জেন্টিনা এখনও ব্রাজিলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
বাংলাদেশের আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে প্রায় ২৬৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে আর্জেন্টিনা থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ ব্রাজিল থেকে আমদানি আর্জেন্টিনার তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি।
গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশের আমদানি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ১৭৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হলেও চার বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ২৬৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা থেকে আমদানির পরিমাণ একই সময়ে বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক ধীর এবং বছরভেদে ওঠানামা করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় ব্রাজিলের অবস্থান ষষ্ঠ। দেশের মোট আমদানির প্রায় ৪ শতাংশ আসে এই দেশ থেকে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা রয়েছে ১৭তম স্থানে। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ব্রাজিলের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে।
ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় চিনি ও চিনিজাত পণ্য। পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তুলাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আসে দেশটি থেকে। এছাড়া তেলবীজ, গম, ভুট্টা, ভোজ্যতেল, লোহা ও ইস্পাত, ওষুধ, পশুখাদ্য, কাঁচা চামড়া, কাঠের মণ্ড, কাগজ, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, বয়লার এবং বিভিন্ন ধরনের শিল্প সরঞ্জামও ব্রাজিল থেকে আমদানি করা হয়।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা থেকে সবচেয়ে বেশি আসে ভোজ্যতেল, প্রাণিজ চর্বিজাত পণ্য, গম, ভুট্টা, সয়াবিন মিল বা খইল, তেলবীজ, তুলা এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল। বিশেষ করে প্রাণিখাদ্য শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের বিশাল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, উন্নত শিল্প উৎপাদন এবং বড় ভোক্তা বাজার বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার বাজার ছোট হলেও দ্রুত প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সঠিক নীতি সহায়তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নতুন পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটিতেও বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তাদের মতে, শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি সরাসরি নৌপথ, সহজ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার করা গেলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—উভয় দেশের সঙ্গেই বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
ফুটবলের আবেগে দুই দেশ সমান জনপ্রিয় হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবধান স্পষ্ট। বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দক্ষিণ আমেরিকান বাণিজ্যিক অংশীদার ব্রাজিল। তবে দ্রুত বাড়তে থাকা রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আর্জেন্টিনাকেও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে।

