২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এ সময় রপ্তানিতে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ পতন হয়েছে, যা প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময়ে বাংলাদেশ একসঙ্গে দুই ধরনের চাপে পড়েছে—রপ্তানির পরিমাণ কমা এবং প্রতি কেজি দামের পতন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ যেখানে একদিকে দাম বা পরিমাণ ধরে রাখতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশ দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের “ইইউ রপ্তানি নথি” অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ সময়ে আমদানি নেমে এসেছে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ইউরোতে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩১ বিলিয়ন ইউরো। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরোতে। আগের বছর একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ইউরো।
পরিমাণের দিক থেকেও বড় পতন হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি ভলিউম কমেছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ, নেমে এসেছে ৪৩৫ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন কেজিতে। একই সঙ্গে গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে প্রতি কেজি ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে।
শুধু এপ্রিল মাসের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ওই মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য কমেছে ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং গড় মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
ইউরোপীয় বাজারে সামগ্রিকভাবে চাপ থাকলেও বিভিন্ন দেশ ভিন্ন কৌশলে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। চীন এ সময় সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। তাদের রপ্তানি মূল্য কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে তারা রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য তারা দাম কমিয়ে প্রতি কেজি ১৯ দশমিক ৪৪ ইউরোতে নামিয়েছে।
ভিয়েতনাম তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে। তাদের রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। যদিও পরিমাণ কমেছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ, তবে প্রতি কেজি দাম ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে ২৯ দশমিক ৪৩ ইউরো হয়েছে। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে ইউনিট মূল্য সামান্য বেড়েছে ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ভারতের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। সেখানে পরিমাণ ও দাম—দুই ক্ষেত্রেই পতন হয়েছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তাদের রপ্তানির পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়লেও ইউনিট মূল্য ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে যাওয়ায় মোট আয় কমেছে ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ একই সঙ্গে রপ্তানির পরিমাণ ও দাম—দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়েছে, যা অন্য বড় প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের একটি দুর্বল দিক নির্দেশ করে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে হলে মূল্য নির্ধারণ কৌশল পুনর্বিবেচনা, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের পোশাক খাতে প্রবেশ বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।

