দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও দেশের সংগঠিত আইসক্রিম শিল্প এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী, মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং নতুন করের চাপ—সব মিলিয়ে শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কয়েকটি বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হিমশিম খাবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশের আইসক্রিম বাজার প্রায় তিন গুণ বেড়ে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার আকার ধারণ করেছে। এই সময়ে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন অবকাঠামো এবং বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় ও করের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় সেই বিনিয়োগ এখন প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
বাংলাদেশ আইসক্রিম প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আইসক্রিমের ওপর প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, নতুন এই কর আরোপ হলে ইতোমধ্যে ব্যয় সংকটে থাকা শিল্পের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।
সমিতির হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট আইসক্রিম বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ছোট ও অনানুষ্ঠানিক উৎপাদকরা। তাদের বড় একটি অংশ ভ্যাট পরিশোধ করে না এবং অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তার নির্ধারিত মানও পুরোপুরি অনুসরণ করে না। বিপরীতে সংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফি এবং অন্যান্য সরকারি ব্যয় নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। ফলে একই বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে কর পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
সমিতির সভাপতি নিয়াজ আহমেদ বলেন, নিয়ম মেনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে সরকারের জন্য রাজস্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে করের বাইরে থাকা উৎপাদকদের সঙ্গে কম দামে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এতে বৈধ ব্যবসা দুর্বল হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, গত দুই বছরে আইসক্রিম উৎপাদনের ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং ২০২৪ সালে সম্পূরক শুল্ক আরোপের কারণে এই ব্যয় আরও বেড়েছে।
দেশীয় আইসক্রিম শিল্প মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। দুধের গুঁড়া, ডেইরি ক্রিম, কনডেন্সড মিল্ক, উদ্ভিজ্জ চর্বি, কোকো, বিভিন্ন ফ্লেভারিং উপাদান এবং প্যাকেজিং সামগ্রী নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, স্পেন, মালয়েশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এসব কাঁচামালের ওপর বর্তমানে ৩৭ থেকে ১২৭ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দিতে হচ্ছে।
শুধু কাঁচামালই নয়, আইসক্রিম সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক ফ্রিজ আমদানিতেও ১০০ শতাংশের বেশি কর দিতে হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, এসব ফ্রিজ বিলাসপণ্য নয়; বরং খাদ্যপণ্য নিরাপদ রাখার জন্য অপরিহার্য শিল্পযন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এ খাতে কর কমানো গেলে উৎপাদন ব্যয়ও কমবে।
প্রতিবেশী ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে উদ্যোক্তারা বলেন, সংগঠিত শিল্পকে উৎসাহ দিতে এবং অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন কমাতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটি আইসক্রিমের ওপর কর ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে শিল্পটি আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
শিল্প মালিকদের দাবি, দেশের সাতটি প্রধান সংগঠিত আইসক্রিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে আর্থিক সংকটে পড়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতেও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে কর, বিদ্যুৎ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আইসক্রিমের বিক্রি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের বদলে এখন উৎপাদন সচল রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পোলার আইসক্রিমের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শাহ মাসুদ ইমাম বলেন, আইসক্রিমকে বিলাসপণ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত দুধভিত্তিক একটি খাদ্যপণ্য, যার পুষ্টিগুণ রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয় বলে সম্পূরক শুল্ক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
উৎপাদকরা সরকারের কাছে কয়েকটি নীতিগত সহায়তা চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক ফ্রিজের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো, আইসক্রিম শিল্পের জন্য পৃথক এইচএস কোড নির্ধারণ এবং অনানুষ্ঠানিক উৎপাদকদের কার্যক্রমে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, আইসক্রিম শিল্প কেবল একটি ভোগ্যপণ্যের বাজার নয়; এটি দুগ্ধশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন, পরিবহন এবং খুচরা বিক্রিসহ বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং সরকারও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়। তাই শিল্পটির টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে করনীতি, আমদানি নীতি এবং বাজার তদারকিতে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। অন্যথায় সংগঠিত উৎপাদকরা দুর্বল হয়ে পড়লে অনিয়ন্ত্রিত বাজার আরও বিস্তৃত হতে পারে, যা ভোক্তার স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ এবং সরকারি রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

