দেশে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। আবাসিক গ্যাসের সংকট আগামী কয়েক বছরে আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের বাজার-আধিপত্য কমাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় পরিসরে এলপিজি সরবরাহে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে এলপিজি অবকাঠামো সম্প্রসারণে একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোংলা ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় নতুন এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট ও সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেড় বছরের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে এলপিজি সরবরাহের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্পও বাতিল করা হয়েছে। এর একটি ছিল আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১৭ লাখ ৫০ হাজার প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন এবং অন্যটি ছিল পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন ও নতুন পাইপলাইন নির্মাণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যতে আবাসিক খাতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে আসবে বলে এই বিনিয়োগকে আর কার্যকর মনে করা হচ্ছে না। পরিবর্তে এলপিজি ব্যবস্থার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার আবাসিক, বাণিজ্যিক, সিএনজি স্টেশন ও কিছু শিল্প গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকে কিংবা একেবারেই গ্যাস পাওয়া যায় না।
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকায় প্রবেশ করা বিভিন্ন সঞ্চালন লাইনে আগের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস কম আসছে। ফলে রাজধানীর অনেক এলাকায় রান্নার জন্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই সংকট গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ ও রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
পেট্রোবাংলা ও তিতাসের পরিসংখ্যানেও গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ কমার প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৩ সালে দেশে আমদানিকৃত এলএনজিসহ দৈনিক গড় গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৭৭ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। ২০২৫ সালে সামান্য বাড়লেও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দৈনিক সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২৫৬ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটে। একইভাবে দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ প্রতিষ্ঠান তিতাসেও সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমানে দেশের এলপিজি বাজারের বেশিরভাগই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রতি মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি এলপিজি ব্যবহৃত হলেও এর মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ সরবরাহ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান। বাকি চাহিদা পূরণ করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানি করে অন্য কোম্পানির কাছে সরবরাহ দেয়। এই ব্যবস্থার কারণে বাজারে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যেই বিপিসি সরকারি পর্যায়ে এলপিজির উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, সরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও স্থিতিশীল হবে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আরও রয়েছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক একটি এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ, যেখান থেকে বছরে প্রায় ১২ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই এলাকায় জাহাজ থেকে জাহাজে এলপিজি স্থানান্তরের সুবিধাসহ একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল এলাকায় বড় আকারের সংরক্ষণ ও বিতরণ সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এলপিজিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বাড়বে। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই নয়, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে এলপিজি পৌঁছে দেওয়াও সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বর্তমানে নেওয়া উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি এলপিজি বাজারেও নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

