সরকারি ব্যয় আরও কার্যকর করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদারের লক্ষ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় নেওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি সেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক এই প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলমান প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি শক্তিশালী করা।
প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্রায় ৩ হাজার ৪৩ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে এবং বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করবে। পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার আওতায় এনে সেবার মান উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ব্যবস্থাপনা আরও স্বয়ংক্রিয় হবে, সরকারি হিসাব ও নিরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন করা হবে, জাতীয় আয় ও মূল্যস্ফীতির পরিমাপ আরও নির্ভুল করা হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও তদারকিতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাও আরও আধুনিক হবে। ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় পদ্ধতিতে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, অনিয়ম কমানো এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে সম্পন্ন করার সক্ষমতাও বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, কর প্রশাসন, তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার আনার চেষ্টা করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যাতে নীতিনির্ধারণের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত তথ্য পাওয়া যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ই-ইনভয়েসিং, সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে কর পরিপালন সহজ করা হবে এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
অন্যদিকে পরিকল্পনা বিভাগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় আরও উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি যুক্ত করবে, যাতে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হয়।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। বর্তমানে যেখানে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন সম্পন্ন হতে প্রায় ৭২ মাস সময় লাগে, সেখানে ভবিষ্যতে তা কমিয়ে মাত্র ৯ মাসে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের জন্য শক্তিশালী ও স্বচ্ছ সরকারি প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। জনগণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও নিচে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে প্রায় ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এজন্য কর ফাঁকি কমানো, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক, নিরাপদ এবং ক্লাউডভিত্তিক ই-জিপি ভার্সন ২.০ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে আইএমইডি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি, কর আদায়ে স্বচ্ছতা এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রকৃত সুফল পেতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প দেশের সরকারি প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

