স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধরে রাখতে একযোগে দুটি পথ অনুসরণ করছে বাংলাদেশ। একদিকে ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ চলছে, অন্যদিকে জিএসপি প্লাস (GSP+) সুবিধা পাওয়ার চেষ্টাও জোরদার করেছে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কারণ বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায় এবং বর্তমানে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার আওতায় সেগুলো শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে।
চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত থাকলেও সরকার তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে। সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বর্তমান সময়সূচি বহাল থাকলেও ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইইউ বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা চালু রাখবে। এরপর থেকেই নিয়মিত শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ রপ্তানি এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সুবিধার আওতায় রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ইইউর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিই সরকারের লক্ষ্য। তবে এ ধরনের আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় একই সঙ্গে জিএসপি প্লাস নিয়েও এগোচ্ছে বাংলাদেশ, যাতে কোনো সময়ই ইউরোপের বাজারে শুল্ক সুবিধার শূন্যতা তৈরি না হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইইউর সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ), প্রচলিত এফটিএ অথবা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশন বাংলাদেশকে জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে তারা বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে মূল্যায়ন করছে।
একই সময়ে জিএসপি প্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৩২টি আন্তর্জাতিক সনদের অধিকাংশ শর্তই বাংলাদেশ পূরণ করেছে বলে দাবি করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শ্রম আইন সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন অনুমোদনের ফলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের ধারণা।
তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এফটিএই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর সমাধান। তার মতে, জিএসপি প্লাস পেলেও ইইউর নতুন বিধিমালা অনুযায়ী পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করায় বাংলাদেশের সব রপ্তানি শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় নাও থাকতে পারে।
বর্তমানে ইইউর পোশাক আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে বাংলাদেশ থেকে, যেখানে জিএসপি প্লাস সুবিধার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা ৬ শতাংশ। এছাড়া জিএসপি-আওতাভুক্ত মোট পোশাক আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশ বাংলাদেশের, যা নির্ধারিত ৩৭ শতাংশ সীমার অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ইউরোপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। তাই শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে সরকারকে সব ধরনের আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ছিল ইইউর ৩৫তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ওই বছর দুই পক্ষের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক। ২০২৪ সালে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ থেকে ১৯ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পণ্য ইইউতে প্রবেশ করেছে এবং এ সুবিধা ব্যবহারের হার ছিল ৯৬ শতাংশ।

