ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি পোশাকের বাজারে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই বাজারে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে এত বড় পতন আর কারও হয়নি। ফলে ইইউতে পোশাক রপ্তানি কমার দিক থেকে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপের বাজারে আরও আক্রমণাত্মকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করেন। রাষ্ট্রীয় সহায়তার কারণে তারা মূল্যছাড় দিয়ে ক্রয়াদেশ সংগ্রহে সক্ষম হন। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হওয়ায় অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দেশটিতে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করছে। এর পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপে পোশাকের চাহিদাও কিছুটা কমেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা।
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউ মোট ২ হাজার ৭৭৭ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে।
ইইউর বাজারে সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ চীন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশটি ৭৯৫ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। যদিও তাদের রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ ইইউতে সামগ্রিক আমদানি কমলেও চীনের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ইইউর ক্রেতারা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি পরিমাণে ক্রয় কমিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ ৬০৯ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৭৫৪ কোটি ইউরো। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ইইউতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইউরোপের ভোক্তাদের মধ্যে পোশাকের চাহিদা কমেছে। দ্বিতীয়ত, চীন আগ্রাসী বিপণনের মাধ্যমে কম দামে ক্রয়াদেশ নিচ্ছে। তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার পর অনেক ইউরোপীয় ক্রেতা সেখানে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, এই প্রবণতা আগামী এক বছরে আরও বাড়তে পারে এবং বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ বা ১ হাজার ৭৩৬ কোটি ডলারের পোশাক গেছে ইইউর বাজারে। তবে একই সময়ে এই বাজারে রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।
চীন ও বাংলাদেশের পর ইইউতে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে তুরস্ক ২৪২ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ভারত ১৬৪ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করলেও দেশটির রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশ।
অন্যদিকে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। এই সময়ে তারা ১৩৭ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এছাড়া কম্বোডিয়ার রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৮ শতাংশ, মরক্কোর ৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১৮ শতাংশ।
মূল্যের দিক থেকে চীন বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও রপ্তানির পরিমাণে বাংলাদেশ এখনও এগিয়ে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে চীন ইইউতে ৪১ কোটি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৪৪ কোটি কেজি পোশাক, যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কম। চীনের ক্ষেত্রে এই হ্রাস ছিল মাত্র সোয়া ৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো রপ্তানিমূল্য। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে চীন প্রতি কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে ১৯ দশমিক ৪৪ ইউরো দরে। বিপরীতে বাংলাদেশ প্রতি কেজি রপ্তানি করেছে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে, যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশ কম। একই সময়ে চীনের গড় মূল্য কমেছে মাত্র ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার প্রতি কেজি রপ্তানিমূল্য বেড়েছে, আর ভারতের কমেছে প্রায় পৌনে ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, চীন যখন ইউরোপের বাজারে আগ্রাসীভাবে বিপণন শুরু করে, তখন তারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি সুযোগ-সুবিধা কমে গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বা রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চীনা প্রতিযোগীদের মতো কম দামে ক্রেতাদের কাছে প্রস্তাব দেওয়াও সম্ভব হয়নি।

