জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা কমানোর জন্য আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পক্ষ থেকে জাইকার প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বর্তমান সুদের হার অন্তত ১ শতাংশ কমানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকারের আশঙ্কা, বিদ্যমান সুদের হার বহাল থাকলে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, শুধু আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েই নয়, বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনারও প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর আসন্ন ঢাকা সফরে সুদের হার পুনর্বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর জাপান সফরেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সমাধানে পৌঁছানো যায়।
আগামী বুধবার জাইকার প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। এছাড়া তিনি জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও পরিদর্শন করবেন। যদিও এই সফরেই সুদের হার কমানোর ঘোষণা আসবে—এমন প্রত্যাশা সরকার করছে না, তবে আলোচনার পথ সুগম হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা।
গত এপ্রিল থেকে বাংলাদেশের জন্য জাইকার নতুন ঋণনীতির আওতায় সুদের হার বাড়িয়ে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে একই হার ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। শুধু মূল ঋণই নয়, পরামর্শক সেবার জন্য নেওয়া ঋণের সুদের হারও ০ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। তবে ঋণের ৩০ বছরের পরিশোধকাল, ১০ বছরের রেয়াতকাল এবং ০ দশমিক ০২ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ফি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, জাইকা প্রতি ছয় মাস অন্তর বাংলাদেশের জন্য ঋণের শর্ত পুনর্মূল্যায়ন করে। সে হিসেবে বর্তমান সুদের হার আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। সরকার চাইছে, পরবর্তী পর্যালোচনায় সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হোক।
ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাইকার ঢাকা কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা করেছে। তবে সুদের হার নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাপান সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই আসে। তাই বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে যে, জাইকা ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একই শ্রেণিতে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ধরন ভিন্ন। জাপানি পণ্যের অন্যতম বড় বাজার বাংলাদেশ। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এছাড়া বাংলাদেশ আরও তিন বছর স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদায় থাকছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুদের হার কমানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জাইকা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ ছাড়ের গতি কিছুটা কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ৪২ কোটি ২৪ লাখ ডলার। একই সময়ে নতুন কোনো ঋণচুক্তিও হয়নি।
ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধার আওতায় মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ সুদে জাইকার ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। পরে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর ২০২২ সালে সুদের হার বেড়ে ০ দশমিক ৭ শতাংশ হয়। ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে বেড়ে হয় ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সর্বশেষ চলতি বছর তা ৩ দশমিক ০৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে বিশ্বব্যাংকের বর্তমান ঋণের সুদের হার প্রায় ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে সুদ ২ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণে ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলে জাইকার ঋণ আগের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে বলে মনে করছে সরকার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জাইকার সুদের হার আরও বাড়তে থাকলে এই ঋণ ভবিষ্যতে রেয়াতি ঋণের বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ঋণে অনুদান উপাদান ৩৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সেটিকে আর রেয়াতি ঋণ হিসেবে গণ্য করা হয় না। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন ঋণের আর্থিক চাপ বহন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের চলমান মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশ জাপানের ঋণনির্ভর। তাই সুদের হার বৃদ্ধি প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। এ কারণে সুদের হার পুনর্বিবেচনার সরকারি উদ্যোগ শুধু একটি আর্থিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

