দেশের শিল্প খাতের প্রায় পুরো ভিত্তিই এখন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট ১ কোটি ১৭ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৯ শতাংশই এমএসএমই, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩ কোটিরও বেশি মানুষের।
খাতটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখার পাশাপাশি শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস উপলক্ষে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়, সীমিত সম্পদ ও বৃহৎ জনসংখ্যার দেশের জন্য কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
২০০৬ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২২ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) মিলনায়তনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবসের অনুষ্ঠানে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপিতে এমএসএমই খাতের অবদান এখনও কম। সরকার এ খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে চায়।
তিনি বলেন, গত ১২ থেকে ১৫ বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার কমে যাওয়ায় আয়বৈষম্য বেড়েছে। গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো আরও বড় হয়েছে, কিন্তু নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় বৈষম্যও বেড়েছে।
মন্ত্রী জানান, নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিচ্ছে। এর আওতায় মেন্টরশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প স্থাপনে সহায়তা দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে পাবনা, সিলেট ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে নতুন শিল্পপার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান শিল্পপার্ক পূর্ণ হয়ে গেলে নতুন পার্ক স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইও করা হবে।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমএসএমই উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, এসএমই ক্লাস্টার ম্যাপ হালনাগাদ, ইয়ুথ এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড স্টার্টআপস ফর স্টুডেন্টস (ইয়েস) কর্মসূচি বাস্তবায়ন, উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, রপ্তানি সহায়তা, ব্র্যান্ডিং এবং দেশি-বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি পুরুষ উদ্যোক্তার বিপরীতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা মাত্র সাত লাখ। এই বৈষম্য দূর করা গেলে কর্মসংস্থান, পারিবারিক আয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি সরাসরি আড়াই লাখের বেশি উদ্যোক্তাকে সহায়তা দিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ প্রায় ১৫ হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে, যার অন্তত ২৫ শতাংশ নারী।
তিনি বলেন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ, বাজার সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের এমএসএমই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে এসএমই ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে।

