নতুন অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোনের সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলেও এর প্রকৃত সুবিধা সাধারণ গ্রাহকের পরিবর্তে মোবাইল অপারেটরদের কাছেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। তার মতে, সরকার এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিলেও গ্রাহকদের ইন্টারনেট বা মোবাইল সেবার খরচে এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে না।
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতে বাজেটের প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রযুক্তি খাতের নীতিগত গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা এবং বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
মাহতাব উদ্দিন বলেন, নতুন একটি সিম বিক্রি করতে মোবাইল অপারেটরদের মোট ব্যয় হয় প্রায় ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা। এর মধ্যে শুধু সিম করই ছিল ৩০০ টাকা। বাকি অর্থ যায় সিম উৎপাদন, বিতরণ, বিপণন এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশনসহ অন্যান্য খাতে। ফলে সিম কর তুলে দেওয়ায় প্রতিটি নতুন সিম বিক্রিতে অপারেটরদের প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমে যাবে। এই অর্থ সরাসরি তাদের আর্থিক সাশ্রয়ে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, সিম কর প্রত্যাহারের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নেই। তবে একই পরিমাণ রাজস্ব ছাড় যদি মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক কমানোর মাধ্যমে দেওয়া হতো, তাহলে দেশের কোটি কোটি গ্রাহক সরাসরি উপকৃত হতেন।
তার মতে, বর্তমানে একজন গ্রাহক মোবাইল সেবার জন্য ১০০ টাকা ব্যয় করলে এর প্রায় ৩৯ টাকাই বিভিন্ন ধরনের কর হিসেবে সরকারের কাছে চলে যায়। অর্থাৎ টেলিযোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বড় করদাতা মূলত সাধারণ গ্রাহক। অথচ নতুন বাজেটে তাদের জন্য সরাসরি কোনো কর-সুবিধা রাখা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এবারের বাজেটে মোবাইল অপারেটরদের জন্য একাধিক কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর আরোপিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক সেবার ওপর করও ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপে অপারেটরদের ব্যয় কমলেও গ্রাহক পর্যায়ে সেবার মূল্য কমার নিশ্চয়তা নেই।
মাহতাব উদ্দিনের দাবি, বর্তমানে টেলিকম খাতে আদায়কৃত মোট করের প্রায় ৭০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের পকেট থেকে আসে। নতুন বাজেট কার্যকর হওয়ার পর এই হার আরও বেড়ে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তাই করনীতি প্রণয়নের সময় গ্রাহকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ডেটা ব্যবহারের সামর্থ্যের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে ডেটার দাম কমানো জরুরি হলেও সেই লক্ষ্য অর্জনে এবারের বাজেটে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তার অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে স্পেকট্রামের মূল্য কমানোসহ টেলিকম অপারেটরদের জন্য বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সুবিধা দেওয়া হলেও তার সুফল সাধারণ গ্রাহক পাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট প্যাকেজের দাম বেড়েছে।
নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন সংগঠন সক্রিয়ভাবে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মোবাইল গ্রাহকদের পক্ষে কথা বলার মতো কার্যকর কোনো সংগঠন নেই। ফলে নীতিনির্ধারণের সময় ভোক্তাদের স্বার্থ প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, নীতিনির্ধারণ শুধু দপ্তরে বসে নয়, বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেও করতে হবে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কার্যকর ও জনবান্ধব নীতি গ্রহণ সম্ভব হবে।
স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রসার নিয়েও গুরুত্বারোপ করেন এই টেলিকম বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করা প্রয়োজন, তবে ফিচার ফোন ও স্মার্টফোনকে একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। স্মার্টফোনের ওপর আরও বেশি কর-সুবিধা দেওয়া হলে ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক প্রযুক্তি, অনলাইন শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সম্প্রসারণ আরও দ্রুত হবে।
তার মতে, স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিকৃত স্মার্টফোনের ওপরও কিছুটা কর কমানো প্রয়োজন। কারণ দেশের বাজারে এখনো অধিকাংশ স্মার্টফোন আমদানিনির্ভর এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা স্বল্প সময়ে পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর বলেন, স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে যদি স্মার্টফোনের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তাহলে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হবে। বর্তমানে অনেক মানুষের জন্য স্মার্টফোনই প্রধান কম্পিউটিং ডিভাইস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং অনলাইনভিত্তিক কাজের বিস্তারের ফলে স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, উৎপাদনশীলতারও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে স্টার্টআপ খাতের জন্য কর-সুবিধা ও বিভিন্ন প্রণোদনা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এসব সুবিধা যেন প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছেই পৌঁছায় এবং কোনো ধরনের অপব্যবহার না হয়, সে জন্য কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে প্রযুক্তি খাতের আরেক উদ্যোক্তা রাশাদ কবীর তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কর অব্যাহতি সনদ সংগ্রহে জটিলতার অভিযোগ তুলে বলেন, বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানকে এই সনদ পেতে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি অতিরিক্ত ও অনৈতিক ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। তার মতে, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে কর-সুবিধা ঘোষণার পাশাপাশি সেই সুবিধা সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্তভাবে নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

