উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে দেশে বিদেশি ফলের আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে। আমদানিকারকদের দাবি, বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর মিলিয়ে ১২৬ শতাংশ পর্যন্ত করভার বহন করতে হওয়ায় ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ফলে একদিকে ক্রেতারা কম ফল কিনছেন, অন্যদিকে লোকসানের মুখে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন অনেক আমদানিকারক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান কর কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে আগামী দিনে ফলের আমদানি আরও কমে যেতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু খেজুরের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতিসহ অন্যান্য আমদানি করা ফলের ক্ষেত্রে আগের কর কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরবরাহ পর্যায়ে ২ শতাংশ উৎসে করও কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সেরাজুল ইসলাম জানান, গত কয়েক বছরে ফল আমদানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই হার আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তার ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী ফল আমদানির ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, দেশের বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ফল আমদানি থেকে সরে গেছে। আরও অনেক প্রতিষ্ঠান একই পথে হাঁটছে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমছে এবং সরবরাহও সীমিত হয়ে পড়ছে।
আমদানিকারকদের মতে, সরকারের ধারণা বেশি কর আরোপ করলে রাজস্বও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ করের কারণে আমদানি কমে যাওয়ায় প্রত্যাশিত রাজস্বও আদায় হচ্ছে না। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য ফল কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংগঠনটির দাবি, ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মর্যাদা দেওয়া উচিত। এতে পুষ্টিকর খাদ্যের সহজলভ্যতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষও তুলনামূলক কম দামে ফল কিনতে পারবেন।
এ লক্ষ্যে তারা নিয়ন্ত্রক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত সুপারিশও জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, অতীতে কয়েক দফা শুল্ক কমানো হলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে ফলের দামে তার বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। কারণ আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবহন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয়ও মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, গত চার অর্থবছরে প্রায় সব ধরনের আমদানি করা ফলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫ অর্থবছরে আপেল আমদানি কমেছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কমলা ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ, আঙুর ৩৫ দশমিক ১১ শতাংশ, নাশপাতি ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ডালিমের আমদানি কমেছে প্রায় ৯৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৬ টাকা মূল্যের একটি আপেল দেশে আমদানি করতে প্রায় ১০৫ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন শুল্ক ও কর দিতে হচ্ছে। ফলে আমদানির শুরুতেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
কমিশন আরও বলেছে, আপেল, কমলা, আঙুর ও নাশপাতির মতো ফলের দেশীয় উৎপাদন খুবই সীমিত। তাই এসব পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা তুলনামূলক কম।
আমদানিকারকদের আশঙ্কা, উচ্চ শুল্কের কারণে বৈধ পথে ফল আমদানি নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এর সুযোগে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ফল প্রবেশের প্রবণতা বাড়তে পারে, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ হবে, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ফলের ওপর করনীতি নির্ধারণে রাজস্ব আদায়, জনস্বাস্থ্য এবং বাজার স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অন্যথায় উচ্চ মূল্য, কম আমদানি এবং সীমিত সরবরাহের কারণে সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর ফলের উপস্থিতি আরও কমে যেতে পারে।

