চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার প্রস্তাব কেবল একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়। এটি বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার বৃহত্তর অংশীদারত্বের অংশ। তাই এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দুই দেশের সরকারের মধ্যে হওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।
গতকাল বুধবার বন্দরের নবনির্মিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধনের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। চেয়ারম্যান জানান, এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। শুরু থেকেই বিষয়টি দুই দেশের সরকারের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এগিয়েছে। তাই এটিকে শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক প্রস্তাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারে বন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা একই ছাদের নিচে আনা হয়েছে। কেন্দ্রটিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তা বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড পুরোপুরি সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রায় ২৬ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত রয়েছেন এবং দেশটি থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪৬৫ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ প্রবাসী আয় আসে। এই বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিবেচনায় রেখেই সরকার পর্যায়ে উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর বেসরকারি খাতভিত্তিক অর্থায়ন সংস্থা আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন। প্রকল্প এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
সিপিএ চেয়ারম্যান বলেন, বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হলে দুই দেশের সরকারের মধ্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি মনে করেন, পরিচালনাগত দিক থেকেও এনসিটিতে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারণ বর্তমানে টার্মিনালে ব্যবহৃত ক্রেন ও মালামাল ওঠানামার যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে। যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নেমে এসেছে প্রায় ৭০ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ হার ৯৩ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত।
তার ভাষ্য, বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে এসব যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করতে চাইলে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে এবং কাজ শেষ করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বাণিজ্যিক স্বার্থে দ্রুত বিনিয়োগ করে এক বছরের মধ্যেই আধুনিকায়নের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
তিনি আরো জানান, চলতি বছরের শুরুতে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-আমিরাত যৌথ প্ল্যাটফর্মের বৈঠকের পর এখন একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
আলোচনার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। বাংলাদেশের স্বার্থ এবং দেশের মানুষের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। সব ধরনের আলোচনা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘সিপিএ স্কাই’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও বাস্তবায়ন করছে।

