বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে চায় না বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীলভাবে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে সরকার। এমনটাই জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
গত বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে অর্থনীতিকে কার্যকর ও টেকসইভাবে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সময় নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সেমিনারটির আয়োজন করে। এতে কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন অংশ নেন। সেমিনারে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং টেকসইভাবে উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
আগামী ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে শুল্ক সুবিধা হারানো, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবের কথা উল্লেখ করে দেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএন সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করে। একই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছেও ব্যক্তিগত সমর্থন কামনা করে চিঠি পাঠিয়েছেন।
চলতি বছরের জুনের শুরুতে ইউএন সিডিপি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার সুপারিশ করে। সংস্থাটি তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) জমা দিয়েছে। ইকোসক সেটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠাবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাপসহ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বাংলাদেশ আগের প্রস্তুতিকাল পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
তার ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সরকার ২৫টি অগ্রাধিকার খাত নিয়ে একটি বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা জোরদার এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
ব্যবসা শুরু করার সময়সীমা এক বছর থেকে কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, সরকারের সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে নিতে উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারে উপস্থাপনায় ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কাঠামোগত ও বৈদেশিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। পাশাপাশি প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন এবং অতিরিক্ত সময় কীভাবে নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়নে কাজে লাগানো হবে, তার একটি সময়ভিত্তিক রূপরেখাও উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতেরা বক্তব্য দেন। তারা বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রমের গতি ধরে রাখা জরুরি।
কূটনৈতিক মিশন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদনের প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সমন্বয়কারী গীতাঞ্জলি সিং, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানও সেমিনারে অংশ নেন।

