বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কাটাতে পারেনি চট্টগ্রামের মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরী। প্রকল্প চালুর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও উৎপাদনে যেতে পেরেছে মাত্র আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৫৫ জনের। অথচ পরিকল্পনা ছিল প্রায় ৮০টি শিল্পকারখানা গড়ে তুলে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনার।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, শিল্পনগরীর বড় অংশ এখনো কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া ৮৮টি প্লটের মধ্যে ৫৯টিই ফাঁকা পড়ে আছে। যেসব প্লটে কারখানা হওয়ার কথা ছিল, তার অধিকাংশেই এখনো কোনো স্থাপনা নির্মাণ হয়নি। আবার উৎপাদনে যাওয়া একটি কারখানাও লোকসানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে শিল্পনগরীটি প্রত্যাশিত শিল্পাঞ্চলের বদলে অনেকটাই অসম্পূর্ণ প্রকল্পের চিত্র বহন করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব, ব্যাংকঋণ সংকট, নিরাপত্তা সমস্যা, দক্ষ শ্রমিকের স্বল্পতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা কারখানা নির্মাণ বা উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। ফলে বরাদ্দ নেওয়ার পরও অধিকাংশ প্লট বছরের পর বছর অনাবাদি অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি কারখানা উৎপাদনে যায়। এরপর ধাপে ধাপে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে মাত্র আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
উৎপাদনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়াকুব অটো রাইস মিল, খাজা ভান্ডার, নাছির কেমিক্যাল, আলিফ ফুড, মেঘনা ডাল মিল, ইনোভা টেক্সটাইল, এবি কমোডিটিজ এবং খান অ্যাকসেসরিজ। তবে খান অ্যাকসেসরিজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, লোকসানের কারণে কয়েক বছর আগে উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
বর্তমানে উৎপাদনরত প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ৫৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তবে ইনোভা টেক্সটাইল পুরোপুরি উৎপাদনে গেলে কয়েকশ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। এখন প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক কর্মরত আছেন।
মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীর ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০০৯ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মিরসরাই পৌরসভার পূর্ব তালবাড়িয়া এলাকায় প্রায় ১৫ দশমিক ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে প্রায় ২৩ কোটি টাকার প্রকল্প পরে দুই দফা সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। ২০১৩ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে সময় বাড়তে বাড়তে ২০১৭ সালের জুনে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়।
প্রকল্প শেষ হওয়ার দুই বছর পর প্লট বরাদ্দ কার্যক্রম শুরু হয়। ৮৮টি প্লটের বিপরীতে প্রথমে ১১৪টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে উদ্যোক্তাদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও কয়েকজন নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হয়। পরে নতুন আবেদনকারীদের মধ্য থেকে অবশিষ্ট প্লটও বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে মোট ৮০ জন উদ্যোক্তার কাছে ৮৮টি প্লট বরাদ্দ রয়েছে।
শিল্পনগরীতে বিভিন্ন ধরনের শিল্পের জন্য প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রকৌশল, খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, রাসায়নিক, প্যাকেজিং, সিরামিক, বনজ এবং চামড়াজাত শিল্প উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হলেও অধিকাংশ উদ্যোক্তা এখনো কারখানা নির্মাণ বা উৎপাদনে যেতে পারেননি।
শিল্পনগরীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, অবকাঠামো তৈরি থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় ছোট ও মাঝারি শিল্প পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেও চিঠি দেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পনগরী নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত না করলে এমন প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে না। শুধু প্লট বরাদ্দ দিলেই শিল্পায়ন হয় না; উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংকঋণ, দক্ষ জনবল এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান, ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে শিল্পনগরীটি এখনো চট্টগ্রামের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় সরকারি অর্থে নির্মিত এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরেই অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে।

