দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে পাঁচ বছর ও তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে একই সময়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন মালিকানার হার সামান্য কমেছে।
যদিও ব্যক্তিগত মালিকানায় কিছুটা পতন দেখা গেছে, তবু মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মোট সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে কম্পিউটার ব্যবহার ও পরিবারের স্মার্টফোন মালিকানাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এসব তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত আইসিটি অ্যাকসেস অ্যান্ড ইউজ সার্ভে ২০২৫-২৬–এর সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে।
জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ সময়কালের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ছিল ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আর অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশে ডিজিটাল সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন মালিকানার ক্ষেত্রে সামান্য নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে মোবাইল ফোনের মালিক ছিলেন ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও এই হার খুব সামান্য কমেছে, তবু প্রথম প্রান্তিকের ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় তা এখনও অনেক বেশি।
ব্যক্তিগত মালিকানা কিছুটা কমলেও মোবাইল ফোন ব্যবহারের হার বেড়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যের ফোন বা ভাগাভাগি করে ব্যবহৃত ফোন যুক্ত করলে তৃতীয় প্রান্তিকে মোবাইল ব্যবহারকারীর হার দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, নিজস্ব মোবাইল না থাকলেও যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ বাড়ছে।
কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ধীরগতির উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হার বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এটি ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং প্রথম প্রান্তিকে ১০ শতাংশ। যদিও প্রবৃদ্ধি ধীর, তবে ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারভিত্তিক তথ্যেও একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র পাওয়া গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ হার ছিল ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রথম প্রান্তিকে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে যেখানে পরিবারভিত্তিক ইন্টারনেট সংযোগ ছিল ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ, সেখানে চলতি অর্থবছরে তা আরও বেড়েছে।
পরিবারে মোবাইল ফোনের উপস্থিতি প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে। জরিপ অনুযায়ী, তিনটি প্রান্তিকজুড়েই ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে। অর্থাৎ দেশে মোবাইল ফোন এখন প্রায় সর্বজনীন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
স্মার্টফোন মালিকানাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারের কাছে স্মার্টফোন রয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ হার ছিল ৭৩ শতাংশ এবং প্রথম প্রান্তিকে ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের তুলনায়ও এতে সামান্য অগ্রগতি হয়েছে।
পরিবারে কম্পিউটার মালিকানার চিত্র প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এলেও তৃতীয় প্রান্তিকে আবার ৯ শতাংশে ফিরে এসেছে। এটি আগের অর্থবছরের সমান।
অন্য সূচকগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। টেলিভিশন থাকা পরিবারের হার দ্বিতীয় প্রান্তিকের ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে তৃতীয় প্রান্তিকে সামান্য কমে ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে রেডিও থাকা পরিবারের হার পুরো বছরজুড়েই প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি স্থির রয়েছে।
ল্যান্ডফোনের ব্যবহার আগের মতোই কমছে। বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারের ল্যান্ডফোন রয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। বিপরীতে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার যোগাযোগের জন্য শুধুমাত্র মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভর করছে।
বিদ্যুৎ সুবিধার ক্ষেত্রেও সামান্য পরিবর্তন এসেছে। প্রথম প্রান্তিকে ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তৃতীয় প্রান্তিকে তা কমে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সুবিধা এখনও প্রায় সর্বজনীন অবস্থায় রয়েছে।
বিবিএসের এই জরিপটি দেশের ৬৪টি জেলার ২ হাজার ৫৬৮টি নমুনা এলাকায় কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পারসোনাল ইন্টারভিউয়িং (ক্যাপি) পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। প্রতি প্রান্তিকে ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বছরে মোট প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার পরিবারের তথ্য এই জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট ব্যবহার ও স্মার্টফোনের বিস্তার ডিজিটাল অর্থনীতি, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কম্পিউটার মালিকানা ও ব্যবহার এখনও তুলনামূলক কম থাকায় ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে আরও বিনিয়োগ ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমানো এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করাও ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিবিএস জানিয়েছে, চারটি প্রান্তিকের তথ্য একত্র করে পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। সেই তথ্য আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে জমা দেওয়া হবে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ডিজিটাল সংযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের অগ্রগতি মূল্যায়নেও কাজে লাগবে।

