কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার পোশাক শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই নারী।
গতকাল বুধবার (১৫ জুলাই) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরে সিপিডি। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’। এ উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় শ্রমবাজারকে একসঙ্গে একাধিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর পরিবর্তন কর্মসংস্থানের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ চাকরি হারিয়েছেন নারী কর্মীরা।
ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলে গেলেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি এখনও গড়ে ওঠেনি। শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (টিভিইটি) ভর্তির হার ২০ শতাংশেরও কম। পাশাপাশি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
ওয়েবিনারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা সেই পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। তার মতে, শ্রমবাজারে দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে অমিল, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং এআই ও অটোমেশনের দ্রুত বিস্তার—সব মিলিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে বড় প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাসও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশনের কারণে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে বিলুপ্ত হতে পারে প্রায় ৯০ লাখ চাকরি। ফলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠবে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮১ লাখের কাছাকাছি স্থির রয়েছে, যদিও উৎপাদন বেড়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ কাজ করলেও এর বড় অংশ অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত। এ অবস্থাকে শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার অন্যতম লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি।
২০৩৫ সালের শ্রমবাজার নিয়ে চারটি সম্ভাব্য চিত্র: সিপিডি ২৭টি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনশীল উপাদান বিশ্লেষণ করে ২০৩৫ সালের জন্য শ্রমবাজারের চারটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতিতেই কয়েকটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত। এর মধ্যে রয়েছে—
- ডিজিটালায়ন আরও বিস্তৃত হবে।
- কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের সেবাখাতে স্থানান্তরিত হবে।
- দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় পিছিয়ে থাকবে।
- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর ভবিষ্যৎ সাফল্যের বড় অংশ নির্ভর করবে।
নীতিমালায় চারটি বড় ঘাটতির কথা বলছে সিপিডি: প্রতিবেদনে বর্তমান নীতিমালার কয়েকটি দুর্বল দিকও চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো—
- গিগ ও প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির শ্রমিকদের জন্য সমন্বিত নীতিকাঠামোর অভাব।
- অটোমেশনের প্রভাব নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়া।
- দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সীমিত প্রতিফলন।
- অধিকাংশ নীতির বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অনুপস্থিতি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, জীবনব্যাপী পুনঃদক্ষতা (রিস্কিলিং) কর্মসূচি চালু, শিল্প প্রণোদনার সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি যুক্ত করা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা (এলএমআইএস) গড়ে তোলা, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান কৌশল বাস্তবায়ন।
প্রতিবেদনের উপসংহারে সিপিডি বলেছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া কঠিন হবে।

