বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ধরে রাখতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আরও ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ নিশ্চয়তা পাওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিয়ে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতেই এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত এই ঋণ নিশ্চয়তা আগামী অক্টোবরেই চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন অর্থায়ন কার্যকর হলে এলএনজি আমদানির জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অর্থায়ন সংগ্রহের সক্ষমতা আরও বাড়বে। এর ফলে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণও সহজ হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার আওতায় পেট্রোবাংলার জন্য ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ঋণ নিশ্চয়তা রয়েছে। নতুন করে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা যুক্ত হলে মোট নিশ্চয়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তার পরিসর কার্যত দ্বিগুণ হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের অক্টোবরের মধ্যে ঋণ নিশ্চয়তার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো সম্পন্ন হলে নভেম্বর ২০২৬ থেকেই প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তাপত্র খোলার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে ২০২৭ সালের পুরো সময়জুড়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানির জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে দেশের নিজস্ব গ্যাসের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা ছিল। কিন্তু গ্যাসের মজুত কমে আসায় চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরাসরি চাপ তৈরি হয়। শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়ে না, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমানে আবার বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি হলে জ্বালানি ও সারের আন্তর্জাতিক সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থ সংগ্রহের একটি ব্যবস্থা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে জ্বালানি কেনার সক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার নিশ্চয়তা সরাসরি পুরো অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়ার পরিবর্তে পেট্রোবাংলার জন্য ঋণ সংগ্রহের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি ও বাণিজ্যিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে।
বিদ্যমান কাঠামোর আওতায় এই নিশ্চয়তার মাধ্যমে সাত বছরের সময়ে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাণিজ্যিক অর্থায়ন সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
এলএনজি আমদানির জন্য নিশ্চয়তাপত্র এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণসুবিধা আটটি নির্বাচিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান যেমন ডয়েচে ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পাশাপাশি দেশের কয়েকটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকও রয়েছে।
এর ফলে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে পেট্রোবাংলার ওপর সরাসরি চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর কাছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ থাকলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
বিশ্বব্যাংকের নিশ্চয়তা এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তা থাকলে ঋণদাতাদের ঝুঁকি কমে যায়। ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নগদ জামানত বা উচ্চ সুদের চাপ তুলনামূলকভাবে কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা মনে করছেন, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের এই সহায়তা এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহে সহায়ক হবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত ওঠানামা করলে এমন আর্থিক নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন অর্থায়নের আলোচনা কয়েক বছর ধরেই চলছে। আলোচনা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর পেট্রোবাংলাকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে প্রকল্প চুক্তি এবং সিঙ্গাপুরে থাকা ঋণদাতাদের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তি করতে হবে।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে যেতে হবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা কার্যকর করতে শুধু একটি অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
পেট্রোবাংলার আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহকারীদের অনুকূলে ৩০ নভেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নিশ্চয়তাপত্র জারি করতে হবে।
এ সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্ধারিত সময়ে অর্থায়নের কাঠামো কার্যকর না হলে ২০২৭ সালের এলএনজি আমদানির পরিকল্পনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এলএনজি আমদানির জন্য বিশ্বব্যাংকের বর্তমান সহায়তার আওতায় থাকা জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা বৃদ্ধির প্রকল্পটির মূল্য ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ১৮ জুন ২০২৫ প্রকল্পটি অনুমোদন করে।
প্রকল্পটি ২০২৬ সালের শুরুতে কার্যকর হয় এবং এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ৩১ ডিসেম্বর ২০৩১।
বিদ্যমান ব্যবস্থার অধীনে বিশ্বব্যাংকের ঋণ পরিশোধ নিশ্চয়তার ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির অর্থায়নের জন্য আটটি দেশি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক নির্বাচন করেছে পেট্রোবাংলা।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে গত বছর তিনটি বিদেশি ও পাঁচটি দেশীয় ব্যাংক নির্বাচন করা হয়। ২০২৬ সাল থেকে এলএনজি আমদানিতে এসব ব্যাংকের অর্থায়ন সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।এখন নতুন করে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা যুক্ত হলে বিদ্যমান কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নগরায়ণের কারণে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না।
পেট্রোবাংলার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাসের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বছরে ৩০ মিলিয়ন টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে।
এই হিসাব বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। অর্থাৎ এলএনজি আমদানি এখন আর সাময়িক কোনো ব্যবস্থা নয়। বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে গ্যাস কেনার ওপর নির্ভর করতে পারে।
তাই এলএনজি আমদানির জন্য অর্থায়নের স্থায়ী ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ব্যবস্থা গড়ে তোলা সরকারের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংকের নিশ্চয়তা এলএনজি আমদানির অর্থায়ন সহজ করতে পারে, কিন্তু এটি বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি মূলত আমদানির সক্ষমতা ধরে রাখার একটি আর্থিক ব্যবস্থা।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকলে এবং এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়ের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে কিংবা সরবরাহে সংকট দেখা দিলে দেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। দীর্ঘমেয়াদে আমদানির পরিমাণ বাড়তে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই নতুন ঋণ নিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তির ব্যবস্থা হলেও এর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়নও জরুরি।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ নিশ্চয়তা বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অর্থায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের আমদানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এটি সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে শুধু বিদেশি অর্থায়নের ওপর নয়। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতার মাত্রা, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা।

