স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এই অর্জনের পর দেশের অর্থনীতি নতুন কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার মতো কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারাবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা কমে আসা, বিদেশি ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণে অন্তত স্বল্পমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বাড়তি চাপের মধ্যে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার জাতিসংঘের কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চেয়েছে। সরকারের যুক্তি, বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান অনিশ্চয়তা, প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এই সময় দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ব্যবসায়ী সংগঠন ইন্টারন্যাশাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে এখনই প্রয়োজন দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, কার্যকর বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যথায় দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রই উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সংকটের মুখে এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতি:
এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের অর্থনীতি একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এলডিসি উত্তরণ হলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রত্যাশার তুলনায় ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা ইতোমধ্যে অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর সঙ্গে এলডিসি হিসেবে পাওয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুবিধা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
সরকারের মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়, তাহলে তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলো বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে শিশুশ্রম, জোরপূর্বক শ্রম এবং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা-সংক্রান্ত কঠোর বাণিজ্য নীতিও বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ রপ্তানি খাতে:
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। এলডিসি দেশের মর্যাদার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে।
তবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পর এসব বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার বড় অংশ আর কার্যকর থাকবে না। এর ফলে একই পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে বাংলাদেশকে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি ব্যয় বহন করতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শুল্ক সুবিধা হারানোই নয়, রুলস অব অরিজিন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শর্ত পূরণ করাও রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
টেক্সটাইল শিল্পে বাড়ছে দুশ্চিন্তা:
এলডিসি-পরবর্তী সময়ে দেশের টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পকে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা ধরে রাখার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এই শিল্প স্থানীয়ভাবে সুতা ও কাপড় সরবরাহের মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে সুতা আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্প আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব তৈরি পোশাক শিল্পেও পড়বে। আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতে বাড়তে পারে চাপ:
এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা এবং সহজ শর্তে পাওয়া বিদেশি ঋণের সুবিধা হারাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতি সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানো এবং তারল্য সংকটের কারণে নতুন শিল্প ও ব্যবসায় ঋণ বিতরণে গতি কমেছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়তে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতিরিক্ত সময় চাওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা নয়। বরং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং টেকসইভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য এই সময় প্রয়োজন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোর প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি বাংলাদেশ) সভাপতি মাহবুবুর রহমানের মতে, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। রপ্তানি ও প্রবাসী আয় অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করলেও শিল্প খাতের ধীরগতি, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মতো সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা, ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি এলডিসি-পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মাহবুবুর রহমান ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে আধুনিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, পর্যটন এবং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণ যেমন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি বড় অর্জন, তেমনি এটি অর্থনীতির সক্ষমতারও একটি কঠিন পরীক্ষা।
তাদের মতে, শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর প্রভাব মোকাবিলায় রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন, দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বজায় রাখা এবং দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এলডিসি-পরবর্তী সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় সংস্কার যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হলে এলডিসি থেকে উত্তরণ স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি, সময়োপযোগী নীতি এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ করা গেলে এই পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

