দেশে ঋণের উচ্চ সুদের কারণে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ক্রমেই বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রায় অর্ধেক সুদে অর্থায়নের সুযোগ পাওয়ায় এ আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, টাকার মান আরও কমে গেলে এসব ঋণ পরিশোধের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
গত এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে অন্তত তিনটি শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণদাতার কাছ থেকে মোট ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঋণ সংগ্রহ করেছে। এছাড়া সিটি গ্রুপসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি ঋণের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বর্তমানে দেশীয় ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদ যেখানে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ, সেখানে বিদেশি ঋণের সুদ ৭ থেকে ৮ শতাংশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, বিদেশি ঋণ স্বল্প সুদের সুবিধা দিলেও টাকার অবমূল্যায়ন হলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যাংক থেকেও ভালো গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) উজমা চৌধুরী বলেন, বিদেশি ঋণের সুদের হার তুলনামূলক কম হওয়ায় অর্থায়নের ব্যয় হ্রাস পায়। পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থের পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শও দিয়ে থাকে।
সম্প্রতি প্রাণ ডেইরি লিমিটেড, প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেড, বঙ্গা মিলার্স লিমিটেড এবং ময়মনসিংহ অ্যাগ্রো লিমিটেডের জন্য আইএফসি ও নেদারল্যান্ডসের উন্নয়ন ব্যাংক এফএমও থেকে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঋণের অনুমোদন পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণ সহজ হয়। বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে প্রবেশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোও সম্ভব হয়।
দেশীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধেও বিদেশি অর্থ ব্যবহার করছে কিছু প্রতিষ্ঠান। গত জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজকে আইএফসির কাছ থেকে ৮ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দেয়। এ ঋণের একটি অংশ স্থানীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণের পরই তারা এ ঋণের অনুমোদন পেয়েছেন।
এদিকে, গত এপ্রিল মাসে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসকে আইএফসি থেকে ৩ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ঋণ টাকায় বিতরণ ও টাকাতেই পরিশোধ করা হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, সিটি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সিটি সল্ট কাঁচামাল আমদানির জন্য নতুন বিদেশি ঋণের আবেদন করেছে। এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আইএফসি থেকেও ঋণ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আবুল খায়ের গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, বিএসআরএমসহ তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পের আরও বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান কম সুদের বিদেশি ঋণ নিতে আগ্রহী।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি হওয়া ইতিবাচক হলেও বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকলে ঋণগ্রহীতা এবং ব্যাংক—উভয়ের ওপর চাপ বাড়বে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান বলেন, বিদেশি ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে ঋণগ্রহীতাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে উজমা চৌধুরীর মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী রপ্তানি আয় রয়েছে, তারা রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়েই ঋণ পরিশোধ করতে পারে। এতে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ বলেন, অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি ঋণ গ্রহণ স্বাভাবিক বিষয়। তবে এ ধরনের ঋণ মূলত রপ্তানিমুখী বা বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। পাশাপাশি কার্যকর হেজিং ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ ২০ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার স্বল্পমেয়াদি এবং ৯ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ।
এদিকে বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালার আওতায় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণ নিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদন লাগবে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিতে পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে ১৫ জুলাই জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সীমার মধ্যে বিদেশি মূল প্রতিষ্ঠান, সহযোগী বা শেয়ারহোল্ডারের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কম সুদের বিদেশি ঋণ শিল্প খাতের বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

