যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের কার্যকর মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে অন্তত ২৫ শতাংশে। যদিও রপ্তানিকারকরা বলছেন, নতুন সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কের পরিমাণ বাড়েনি; আগের অস্থায়ী শুল্কের জায়গায় একই হারের নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য রোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) তদন্তের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত নোটিস অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন এই শুল্ক আরোপ করা হয়। নতুন শুল্ক ওয়াশিংটন সময় ২৪ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পথে থাকা পণ্যগুলো ২৮ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত নতুন শুল্ক থেকে ছাড় পাবে।
এর আগে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। এর সঙ্গে সেকশন ১২২-এর আওতায় আরোপিত ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক যোগ হয়ে কার্যকর শুল্কের হার দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ শতাংশে। এখন সেকশন ১২২-এর সেই অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ায় একই হারে সেকশন ৩০১-এর অধীনে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর মোট কার্যকর শুল্কের পরিমাণে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। রপ্তানিকারকদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় শুল্কের হার একই থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাণিজ্য নীতি:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাণিজ্য ঘাটতি থাকা দেশগুলোর পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেন। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়।
প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং একপর্যায়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেডের (এআরটি) পর শুল্কহার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর ওই শুল্ক কার্যকর হয়নি। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেন।
জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে ইউএসটিআর গত ১২ মার্চ তদন্ত শুরু করে। বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিষয়ে পরিচালিত এ তদন্তে জনমত, শুনানি, সরকারের বক্তব্য এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত পর্যালোচনা করা হয়। গত ২ জুন প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ভিত্তিতেই সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। তবে কিছু পণ্য এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং সেকশন ২৩২-এর আওতায় থাকা গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামাজাত পণ্য। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্ত পূরণকারী পণ্যও নতুন শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে।
নতুন শুল্ক কার্যকরের পর সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশের কার্যকর শুল্ক পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেকশন ১২২-এর আওতায় থাকা ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্কের পরিবর্তে এখন সেকশন ৩০১-এর আওতায় একই হারের শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এমন ১৭টি দেশের একটি, যাদের জন্য সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক থাকায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হতে পারে।
তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক ক্ষতি না হলেও বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশা পূরণ না হওয়ায় হতাশা রয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আগের ১০ শতাংশ শুল্কের জায়গায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য ট্যারিফ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসছে না।
তিনি জানান, ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে ভারত ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে শুল্কের পার্থক্য নেই।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, প্রতিযোগিতার জায়গায় বড় পরিবর্তন না হলেও এআরটি চুক্তির পরও বাংলাদেশ অতিরিক্ত সুবিধা না পাওয়ায় হতাশা রয়েছে। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, নতুন শুল্কের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও সময় লাগবে। ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শুল্কে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের চাপে পড়বে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে শ্রমমান নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং কাঁচামালের উৎস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশের আইনি কাঠামো রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের জায়গায় দুর্বলতা দূর করার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, উচ্চ শুল্ক দীর্ঘমেয়াদে বাজারের চাহিদায় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শুল্ক বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে এবং এর প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮৬ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলারের।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে হলে শুধু শুল্ক নয়, শ্রমমান, উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বাণিজ্য কূটনীতির ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

