চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য মিশ্র চিত্র নিয়ে এসেছে। মাসওয়ারি হিসাবে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য পিছিয়ে রয়েছে দেশের রপ্তানি আয়। তবুও নতুন অর্থবছরের শুরুতে শিল্প ও রপ্তানি খাতে ইতিবাচক গতি ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (৩ আগস্ট) প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। জুন মাসের তুলনায় এই আয় ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের তুলনায় মোট রপ্তানি আয় দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প নতুন অর্থবছরের শুরুতেই কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। জুলাই মাসে এই খাত থেকে এসেছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ডলার। জুন মাসে যেখানে পোশাক রপ্তানি ছিল ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলার, সেখানে এক মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
তবে বার্ষিক তুলনায় পোশাক খাতেও কিছুটা চাপ রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এই খাত থেকে রপ্তানি হয়েছিল ৩৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। সেই হিসাবে চলতি বছরের একই মাসে পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের মজুত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক চাহিদার ধীরগতির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
রপ্তানি গন্তব্যের দিক থেকে আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। জুলাই মাসে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে ৯১ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। বড় রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে এটিই ছিল ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ।
অন্যদিকে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে রয়েছে। জুলাই মাসে জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ৪৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলার এবং যুক্তরাজ্যে ৪৭ কোটি ৮৪ লাখ ২০ হাজার ডলার মূল্যের পণ্য।
প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাময় বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও সৌদি আরবে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই মাসে ভারতে রপ্তানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ, আর সৌদি আরবে বেড়েছে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এটি ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে মাসওয়ারি প্রবৃদ্ধি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বার্ষিক সামান্য পতন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতির প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতেও পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি বাড়ানো গেলে দেশের বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসের রপ্তানি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে মাসওয়ারি প্রবৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে ইতিবাচক অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদ তৈরি করছে। এখন এই ধারা ধরে রাখতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজার বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

