যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। ফলে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হলেও রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পুরোনো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর বিজনেস অ্যান্ড ট্রেডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই এক বছরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড বা ৩৮০ কোটি পাউন্ড। আগের এক বছরের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। একই সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি পাউন্ড। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের পক্ষে বড় উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। এ সময়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫০ কোটি পাউন্ড, যা আগের বছরের তুলনায়ও বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাজ্যের বাজারের গুরুত্ব মূলত তৈরি পোশাকের কারণে। এক বছরে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ডের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই তৈরি পোশাক। পোশাকের বাইরে টেক্সটাইল ফেব্রিক, যন্ত্রাংশ, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য এবং জুতার মতো কিছু পণ্যও বাজারে রয়েছে। কিন্তু মোট রপ্তানির তুলনায় এসব পণ্যের অংশ এখনো অনেক ছোট। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়লেও এর বড় অংশ এখনো একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিটিও রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর বেশি নির্ভর করলে ওই খাতে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে গেলে বা প্রতিযোগিতা বেড়ে গেলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতেও চাপ পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, জুতা ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের মতো বিভিন্ন পণ্যের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব পণ্য বড় পরিসরে রপ্তানি করতে হলে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হবে না; পণ্যের মান, নিরাপত্তা, প্যাকেজিং, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের মতে, রপ্তানি প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক জটিলতা ও ধীরগতিও নতুন পণ্য নিয়ে বাজারে প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করছে।
যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির ৫৩তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার বাংলাদেশ। আমদানির উৎস হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও ভালো যুক্তরাজ্যের ৩৬তম বৃহত্তম আমদানি উৎস বাংলাদেশ। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পরিচিত একটি সরবরাহকারী দেশ। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই পরিচিতিকে শুধু পোশাকের মধ্যে আটকে না রেখে অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে তৈরি হওয়া বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সরবরাহব্যবস্থা ও ক্রেতা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অন্যান্য রপ্তানি খাতকে যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশ করানো সম্ভব হতে পারে।
দুই দেশের বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগের সম্পর্কও রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সঞ্চিত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০ কোটি পাউন্ড। একই সময়ে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের সঞ্চিত বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৮৪ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড। অর্থাৎ বাণিজ্যের পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের আরেকটি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০টি ভ্যাট-নিবন্ধিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পণ্য আমদানি করেছে এবং বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করেছে প্রায় ৬০০টি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এই ব্যবসায়িক যোগাযোগকে আরও কাজে লাগাতে পারলে নতুন রপ্তানি পণ্যের বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার খবরটি ইতিবাচক হলেও এর ভেতরের ছবিটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু পোশাকের ওপর নির্ভরতা এখনো খুব বেশি। তাই আগামী দিনে শুধু কত পাউন্ডের পণ্য রপ্তানি হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন নয়; বরং সেই রপ্তানির কতটা নতুন পণ্য ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে, সেটিও দেখতে হবে। যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পোশাকের বাইরে আরও পণ্য সেখানে জায়গা করে নিতে পারলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও স্থায়ী ও শক্তিশালী হতে পারে।

