দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও কারিগরি সমস্যায় মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে কয়লার ঘাটতির কারণে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। কমেছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
চাহিদা বাড়ছে, কমছে উৎপাদন
গ্যাসের সংকট সরাসরি চাপ তৈরি করছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে। আবার গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে তাদের গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এর পাশাপাশি গরমে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বুধবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে।
রাতেও পরিস্থিতি ছিল কঠিন। মঙ্গলবার রাত ২টায় ১৬ হাজার ৩৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট। ওই সময় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১১৬ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৬ মেগাওয়াট, ভোর ৪টায় ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা যায় রাত ১২টায়—৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট।
এর আগের দিন সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট। আর রোববার রাত ১টায় এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়।
মহেশখালীতে কমেছে গ্যাস সরবরাহ
বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে সেখান থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। বর্তমানে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই টার্মিনাল থেকে ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৪১ কোটি ঘনফুট।
আগামী ১৫ আগস্ট নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম। এরপর এক্সিলারেটের টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সংকটের সময় তা ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গিয়েছিল। বুধবার তা বাড়িয়ে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট করা হলেও পরে আবার কমে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের অভাবে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট।
কয়লা ও বিদ্যুৎ আমদানিতেও ধাক্কা
শুধু গ্যাস নয়, কয়লা সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
পটুয়াখালীর নোরিংকো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াট কমে এখন ১ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি হয়েছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমে এখন ৮০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াটে নেমেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ঘাটতি। জাতীয় গ্রিডের কারিগরি সমস্যা ও কয়লা সরবরাহের কারণে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে আদানি পাওয়ার থেকে আমদানি ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট কমেছে। বর্তমানে সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট।
সবচেয়ে বেশি ভুগছে গ্রামাঞ্চল
দেশের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ পান।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর গড় চাহিদা এখন ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে তারা।
কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। আবার কোনো এলাকায় ১৭ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
রংপুরের গ্রামাঞ্চলে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা, গোপালগঞ্জে প্রায় ১৭ ঘণ্টা, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ১৬ ঘণ্টা, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা এবং গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। শরীয়তপুরের জাজিরার পালেরচরেও একই সময়ে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ অপেক্ষা
পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও সংকট দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি স্টেশনের মধ্যে ৩০টিতেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোথাও কোথাও চালকদের সামান্য পরিমাণ গ্যাস নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।
ক্ষোভ ছড়াচ্ছে, নিরাপত্তা চেয়েছে ৮০ সমিতি
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ক্ষোভ এখন বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনায় রূপ নিচ্ছে। টাঙ্গাইল, দিনাজপুর ও পাবনায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিজেদের অফিস, গ্রিড, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে আইজিপির কাছে চিঠি দিয়েছে।
রাত ৮টার মধ্যে মার্কেট বন্ধ
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। ১২ আগস্ট থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। আগে এসব প্রতিষ্ঠান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ ছিল।
এ ছাড়া সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করতে এবং আলোকসজ্জা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
দ্রুত সমাধানের চেষ্টা
সরকার বলছে, সংকট মোকাবিলায় সম্ভাব্য সব পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে অন্তত একটি এলএনজি কার্গো আনার চেষ্টা চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে যুক্ত করে গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু সাময়িক জ্বালানি ঘাটতির সংকেত নয়; বরং দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

