ঢাকা থেকে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দূরে রোমে আটকে থাকা বিমানের একটি উড়োজাহাজ মেরামত করতে প্রকৌশলী ও যন্ত্রাংশ পাঠানোর খবরটি সামনে আসার পর একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে কি প্রতিটি সমস্যার সমাধান এভাবেই করতে হবে?
গত ৭ আগস্ট টরন্টো থেকে ঢাকার পথে রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমানের ফ্লাইট বিজি৩০৬। সেখানে স্বাভাবিক জ্বালানি নেওয়ার বিরতি থাকার কথা ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজটির কেবিনের চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়ায় সেটি আর উড়তে পারেনি।
উড়োজাহাজটিতে তখন ২৫৯ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১৭৪ জন ছিলেন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। প্রায় আট ঘণ্টা যাত্রীদের উড়োজাহাজের ভেতরেই অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ না করায় শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের অনেকেই দুর্ভোগে পড়েন।
শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধানে ঢাকা থেকে দুই সদস্যের প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়। তারা ৮ আগস্ট রোমে পৌঁছান। প্রকৌশলীরা উড়োজাহাজে পৌঁছানোর পর মাত্র প্রায় দুই ঘণ্টায় ত্রুটি ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু এর মধ্যে যাত্রীদের ভোগান্তি প্রায় ৪০ ঘণ্টায় গড়ায় এবং একই উড়োজাহাজ দিয়ে পরিচালিত পরবর্তী ফ্লাইটও এক দিন পিছিয়ে যায়।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। রোম বিমানের নিয়মিত গন্তব্য। তাহলে সেখানে একটি উড়োজাহাজের জরুরি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগে থেকেই কেন ছিল না?
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন খাতে এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকে চালু আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর কারিগরি সহযোগিতা ব্যবস্থার মাধ্যমে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিমানবন্দরে যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত রক্ষণাবেক্ষণকর্মী ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও এই ব্যবস্থার সদস্য।
রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরও এমন সহযোগিতার সুযোগ থেকে বাইরে নয়। সেখানে ইতালির আইটিএ এয়ারওয়েজসহ অন্য বিমান সংস্থার কার্যক্রম রয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকার পরও শেষ পর্যন্ত ঢাকা থেকে প্রকৌশলী ও যন্ত্রাংশ পাঠাতে হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, একই ধরনের ঘটনা আগে ঘটেছে। গত বছরের ১০ আগস্ট রোমের একই বিমানবন্দরে বিমানের একটি বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ ত্রুটির কারণে আটকে পড়েছিল। তখন ২৬২ জন যাত্রীকে হোটেলে নিতে হয়েছিল, লন্ডন থেকে যন্ত্রাংশ আনা হয়েছিল এবং দুই দিন পর ঢাকা থেকে পাঁচজন প্রকৌশলী পাঠানো হয়েছিল। উড়োজাহাজটি তিন দিন পুরোপুরি অচল ছিল।
ওই ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন, কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং কয়েকটি উপসাগরীয় বিমানবন্দরে অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মিত গন্তব্য সেই তালিকায় ছিল না।
এক বছর পর একই বিমানবন্দরে একই ধরনের সমস্যায় আবারও উড়োজাহাজ আটকে গেল। এটি নিছক দুর্ভাগ্য বলার সুযোগ কম। বরং আগের অভিজ্ঞতা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া হয়নি বলেই এমন পরিস্থিতি আবার তৈরি হয়েছে।
এই ধরনের বিলম্বের আর্থিক ক্ষতিও কম নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের দীর্ঘপথের ফ্লাইটে দীর্ঘ বিলম্ব হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যাত্রীরা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। ২৫৯ জন যাত্রীর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের অঙ্ক প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি টাকার কাছাকাছি।
এর সঙ্গে যোগ হতে পারে যাত্রীদের খাবার, থাকার ব্যবস্থা, উড়োজাহাজ বসিয়ে রাখার কারণে আয় হারানো এবং পরবর্তী ফ্লাইটের সময়সূচি এলোমেলো হওয়ার খরচ। অথচ রোমে আটকে পড়া অন্তত ১৭০ যাত্রীকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই রাত কাটাতে হয়েছে।
সমস্যাটি শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নয়। দেশের বিভিন্ন সরকারি সেবায় একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। বড় প্রকল্প বা সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ খরচ করা হলেও সেটি সচল রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অনেক সময় গুরুত্ব পায় না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্ষেত্রেও এমন চিত্র দেখা গেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২১টি প্রকল্পে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেলপথ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু একই ১৫ বছরে মাত্র ৪০টি নতুন ইঞ্জিন কেনা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রেলওয়ের ২৮১টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৯৪টি অচল ছিল। যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিলম্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মূল সমস্যাটা তাই মানসিকতার। নতুন উড়োজাহাজ কেনা দৃশ্যমান সাফল্য। কিন্তু সেই উড়োজাহাজকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় কারিগরি সক্ষমতা এবং জরুরি ব্যবস্থাপনায় অর্থ ব্যয় করা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। ফলে আগাম প্রস্তুতির বদলে অনেক সময় সমস্যা তৈরি হওয়ার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়াই যেন স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।
বিমানের ক্ষেত্রে এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। প্রতিটি নিয়মিত গন্তব্যে স্থায়ী কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কারিগরি সহযোগিতা ব্যবস্থাকে জরুরি বিকল্প হিসেবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।
বিদেশের কোনো বিমানবন্দরে সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয় প্রকৌশলী বা অনুমোদিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দ্রুত সেবা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেশন কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ক্ষমতা ও অর্থ ব্যয়ের সীমা দেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য ঢাকার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সময় নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
সম্প্রতি সিলেট থেকে ওমরাহ যাত্রীদের একটি দলও উড়োজাহাজের কারিগরি সমস্যার কারণে দুর্ভোগে পড়েছিলেন। অর্থাৎ বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বারবার একই ধরনের সমস্যায় যাত্রীদের ভোগান্তি এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি—দুটিই বাড়ছে।
অথচ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। তাই অর্থের অভাবকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রোমে পাঠানো প্রকৌশলীরা শেষ পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই কাজ করেছেন। তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ নেই।
প্রশ্নটা বরং তাদের কাছে, যারা এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্বে আছেন যেখানে নিয়মিত গন্তব্যে একটি উড়োজাহাজের সামান্য ত্রুটির জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে প্রকৌশলী ও যন্ত্রাংশ পাঠাতে হবে না।
বিমানকে এখন সমস্যার পর সমাধান করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যা হওয়ার আগেই প্রস্তুত থাকার সংস্কৃতিতে যেতে হবে। একই ভুল দ্বিতীয়বার ঘটার পরও যদি শিক্ষা না নেওয়া হয়, তাহলে তৃতীয়বারের দুর্ভোগও শুধু সময়ের অপেক্ষা।

