চলতি অর্থবছরে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার বড় করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। এতে নতুন করদাতা খুঁজে বের করার পরিবর্তে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও কর প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়েছিল, তার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিটগুলোর ওপরও এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটকে গত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি।
গত দুই দশকে বৃহৎ করদাতা ইউনিটগুলোর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর বিভাগের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সেই লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে আয়কর বিভাগের জন্য ৫৫ হাজার কোটি টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর বিভাগের জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছরে মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিট ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায় করে। একই সময়ে আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিট ৪৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থবছরের আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের করভিত্তি এখনও তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির আকার বাড়লেও করদাতার সংখ্যা একই হারে বাড়েনি।
বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং গত এক দশকে কয়েকটি বড় দেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ২০০৫ সালে মূল্য সংযোজন কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের আওতায় ১৬২টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ১০৬টিতে নেমে এসেছে।
আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিটও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণসহ নানা আর্থিক চাপে রয়েছে। দুর্বল অবস্থায় থাকা কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে এই খাত থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের সুযোগ সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক মনে করেন, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত এখনও অনেক কম। তবে একই করদাতার কাছ থেকে বারবার বেশি কর আদায়ের চেষ্টা না করে নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।
ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা সংস্থার চেয়ারপারসন আবুল কাসেমের মতে, যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত উচ্চ কর দেন এবং করসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলেন, তাদের যেন অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়। নিয়মিত কর প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে অপ্রয়োজনীয় নজরদারি ও যাচাই থেকে সুরক্ষা দেওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস বলেন, রাজস্ব আদায় শুধু কর বিভাগের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও এটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তার মতে, দেশের বড় করদাতাদের মধ্যে ব্যাংকগুলো অন্যতম হলেও বর্তমানে অনেক ব্যাংকই আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
তিনি কর প্রশাসনে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। হাতে পরিচালিত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়ম ও হয়রানির সুযোগও কমানো সম্ভব হতে পারে।
দেশে মূল্য সংযোজন কর আদায়ের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে তামাক, টেলিযোগাযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত রয়েছে। তবে এসব খাতেও নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে রাজস্ব আদায়ে অস্বাভাবিক বড় ধরনের বৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
কিছু কর্মকর্তার মতে, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন লক্ষ্যমাত্রা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উৎসাহ কমিয়ে দিতে পারে। শুরু থেকেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব মনে হলে রাজস্ব সংগ্রহে আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহও কমে যেতে পারে।
কর্মকর্তারা আরও মনে করেন, শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার দিয়ে দেশের কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত বাড়ানো সম্ভব নয়। অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
নতুন বাজেট ব্যবস্থায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর মূল্য সংযোজন করের বিবরণী জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক ঝামেলা কমাতে এই ব্যবস্থা চালু করা হলেও রাজস্ব কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এর ফলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কারখানা বন্ধ থাকার কারণে রাজস্বে কতটা ক্ষতি হচ্ছে, তা দ্রুত নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া কিছু নতুন কর ছাড়ের কারণেও সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে। চার লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ছাড় দেওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা রাজস্ব কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুঠোফোনের সিম কার্ডে দেওয়া ছাড়ের কারণে আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব কমার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং শিল্পখাতে গ্যাসের ব্যবহার হ্রাস পাওয়ার কারণে এ খাত থেকে মূল্য সংযোজন কর আদায়ে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশে বৃহৎ করদাতা ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজস্ব প্রশাসন সংস্কারের অংশ হিসেবে। আয়কর বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিট চালু হয় ২০০২ সালে এবং মূল্য সংযোজন কর বিভাগের ইউনিট চালু হয় ২০০৫ সালে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছিল।
তবে বর্তমানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, একই সীমিত সংখ্যক করদাতার ওপর দীর্ঘ সময় নির্ভর করে রাজস্ব আয় কতটা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়াতে হলে নতুন করদাতা শনাক্ত করা, কর প্রশাসন আধুনিক করা, নিয়মিত কর দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি থেকে রক্ষা করা এবং দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

