দেশে ভুট্টার ব্যবহার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় মূলত মাঠের একটি সাধারণ ফসল হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন হাঁস-মুরগির খাদ্য, মাছের খাদ্য, গবাদিপশুর খাদ্য, বস্ত্রশিল্প এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হয়ে উঠেছে ভুট্টা। শিল্পখাতে চাহিদা বাড়তে থাকায় স্থানীয় উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছালেও আমদানির প্রয়োজন কমছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ঢাকাস্থ কার্যালয়ের সর্বশেষ শস্য ও পশুখাদ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে বাংলাদেশে ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ৬০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উৎপাদনের একটি নতুন রেকর্ড হবে।
তবে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি শিল্পের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে একই সময়ে ভুট্টা আমদানি বেড়ে প্রায় ১৮ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। আগের বিপণন বছরে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন। সে হিসাবে আমদানি বাড়তে পারে প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
চলতি বিপণন বছরের প্রথম তিন মাসেই বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টন ভুট্টা আমদানি করেছে। পশুখাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের শক্তিশালী চাহিদাই এই আমদানির প্রধান কারণ।
দেশে জমির পরিমাণ ও উৎপাদনের দিক থেকে ভুট্টা এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম শস্যে পরিণত হয়েছে। গ্রীষ্ম ও শীত—দুই মৌসুমেই ভুট্টার আবাদ হলেও মোট বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে শীতকালীন ফসল থেকে।
চলতি বিপণন বছরে ভুট্টার উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। আগের বছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৫৯ লাখ টন। একই সময়ে ভুট্টার আবাদি জমি প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৭০ হাজার হেক্টরে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
ভালো ফলন ও বাজারে তুলনামূলক আকর্ষণীয় দাম পাওয়ায় কৃষকদের কাছে ভুট্টা লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও মাছ চাষের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ কৃষকদের উচ্চফলনশীল সংকর বীজ এবং উন্নত চাষপদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।
দেশে ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস পশুখাদ্য শিল্প। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের হিসাবে, ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে পশুখাদ্যসহ অন্যান্য কাজে ভুট্টার ব্যবহার বেড়ে প্রায় ৭২ লাখ ৫০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে। আগের বছরে এই ব্যবহার ছিল প্রায় ৭১ লাখ টন।
সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত পশুখাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন বাণিজ্যিক পশুখাদ্য উৎপাদন করে। এর বাইরে অনিবন্ধিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আরও প্রায় ৫ লাখ টন পশুখাদ্য উৎপাদন করে বলে ধারণা করা হয়।
মোট বাণিজ্যিক পশুখাদ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই হাঁস-মুরগির জন্য ব্যবহার করা হয়। বাকি অংশ মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হাঁস-মুরগির খাদ্য তৈরিতে ভুট্টাই প্রধান কাঁচামাল। পাশাপাশি মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্য উৎপাদনেও এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
পশুখাদ্য শিল্পে ভুট্টার পাশাপাশি সয়াবিনের খৈল, মাছের গুঁড়া, ভাঙা চাল, চালের কুঁড়া, সরিষা ও রাইয়ের খৈলসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়। তবে পুষ্টিগুণ, বাজারদর এবং কাঁচামালের সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে খাদ্যের উপাদানের অনুপাত পরিবর্তিত হয়।
পশুখাদ্য শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভুট্টার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। এর প্রভাবে মাত্র এক মাসে স্থানীয় বাজারে ভুট্টার দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৮ টাকায় পৌঁছেছে।
ব্রাজিল থেকে নতুন ভুট্টার চালান দেশে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, আমদানি করা এই ভুট্টার খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ৪২ টাকা হতে পারে, যা স্থানীয় বাজারের দামের চেয়েও বেশি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পশুখাদ্য শিল্পে প্রয়োজনীয় ভুট্টার প্রায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদন থেকে পাওয়া যায়। বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
তবে ভুট্টার ব্যবহার এখন আর শুধু পশুখাদ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। খাদ্যপণ্য, বীজ এবং শিল্পকারখানায় ভুট্টার ব্যবহারও বাড়ছে। ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে এসব কাজে ভুট্টার ব্যবহার প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে। আগের বছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ টন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশে শ্বেতসার উৎপাদনকারী ছয়টি প্রতিষ্ঠানই বছরে প্রায় ৩ লাখ টন ভুট্টা ব্যবহার করে। ভুট্টা থেকে তৈরি শ্বেতসারের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী বস্ত্রশিল্প। কাপড় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সুতা শক্ত করার বিভিন্ন পর্যায়ে এই শ্বেতসার ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া ভুট্টা থেকে তৈরি মিষ্টি তরল ও শর্করাজাত উপাদান বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে পশুখাদ্যের পাশাপাশি শিল্পখাতেও ভুট্টার বাজার ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
দেশে উৎপাদন বাড়লেও আমদানির ওপর নির্ভরতা এখনও উল্লেখযোগ্য। গত বিপণন বছরে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানির প্রায় ৬৮ শতাংশ এসেছে ব্রাজিল থেকে। ভারত থেকে এসেছে প্রায় ২৪ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬ শতাংশ এবং আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় ২ শতাংশ।
২০১৮ সালের পর গত বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র আবার বাংলাদেশের ভুট্টার বাজারে ফিরে আসে। ওই বছরে দেশটি বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার টন ভুট্টা রপ্তানি করে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বছরে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ টন ভুট্টা আমদানি করেছে। তবে স্থানীয় উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক দামের ওপর নির্ভর করে বছরে বছরে এই পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
দেশে ভুট্টার দাম সাধারণত ফসল সংগ্রহের সময় কমে আসে। মে ও জুন মাসে শীতকালীন ভুট্টার সরবরাহ বাড়ায় বাজারদর তুলনামূলক কম থাকে। এরপর আগস্ট থেকে মজুত কমতে শুরু করলে এবং পশুখাদ্য ও খাদ্যশিল্পের চাহিদা বাড়লে দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়। নতুন দেশীয় ফসল অথবা আমদানি করা ভুট্টা বাজারে না আসা পর্যন্ত দাম বাড়ার প্রবণতা থাকতে পারে।
ভুট্টার বাজার সম্প্রসারিত হলেও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে। চাল ও গমের মতো ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য দেশে আলাদা সরকারি গুদাম ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি পশুখাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মজুত রাখে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেরই দুই থেকে তিন মাসের ভুট্টা সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।
২০২৬-২৭ বিপণন বছর শেষে দেশে ভুট্টার মজুত প্রায় ৩ লাখ ৪ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে। আগের বছরের শেষে এই মজুত ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার টন।
সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশে ভুট্টার মোট উৎপাদন ৬০ লাখ টনে পৌঁছালেও ব্যবহার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭৬ লাখ ৭০ হাজার টনে। ফলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়লেও ঘাটতি পূরণে আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
হাঁস-মুরগি, মাছ ও গবাদিপশুর বাণিজ্যিক উৎপাদন আরও বাড়তে থাকলে আগামী দিনগুলোতে ভুট্টার চাহিদাও বাড়বে। তাই দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অতিরিক্ত মূল্য ওঠানামার প্রভাব থেকে পশুখাদ্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে সুরক্ষিত রেখে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা।

