ব্যবসায়ীদের কাছে বিষয়টি শুনতে স্বস্তির মনে হতে পারে একাধিক হিসাব, আলাদা হার ও জটিল নিয়মের বদলে একটি নির্দিষ্ট হার। কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। ছোট দোকান, পারিবারিক ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য হারটি কত হবে, কীভাবে হিসাব হবে এবং এতে শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচ ও পণ্যের দাম বাড়বে নাকি কমবে সেই উত্তরই ঠিক করবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান ভ্যাট কাঠামো একেবারে এক হারের নয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় সাধারণ ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ হলেও নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবায় কম হার, অব্যাহতি এবং অন্যান্য ব্যবস্থা রয়েছে। ছোট ব্যবসার জন্য আবার ভ্যাটের পরিবর্তে টার্নওভার করের ব্যবস্থাও রয়েছে। বিদ্যমান কাঠামোয় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা ব্যবসা টার্নওভার করের আওতায় থাকে, ফলে বড় প্রতিষ্ঠানের মতো একইভাবে ভ্যাট হিসাব করতে হয় না।
সমস্যা হচ্ছে, ছোট ব্যবসার বড় একটি অংশের জন্য কর দেওয়ার চেয়ে করব্যবস্থার নিয়ম মেনে চলার খরচই অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায়। হিসাব রাখা, চালান দেওয়া, রিটার্ন জমা, ইনপুট কর সমন্বয় এসব প্রক্রিয়া ছোট ব্যবসার জন্য তুলনামূলক কঠিন। ফলে সরকারও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায় না, আবার ব্যবসাগুলোর একটি অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য সরল ভ্যাট ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট সীমা এবং সহজ হিসাবপদ্ধতিকে কর-অনুবর্তিতা বাড়ানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা হয়েছে।
এখানেই একটু থামা দরকার। একটি নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করলেই যে ছোট ব্যবসার করের বোঝা কমবে, বিষয়টি এমন নয়। ধরুন, একজন ছোট ব্যবসায়ী বছরে ৫০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন। তার ওপর নির্দিষ্ট হারে কর বসানো হলে হিসাব করা সহজ হতে পারে। কিন্তু তিনি যে পণ্য কিনছেন, তার দামের মধ্যে আগে থেকেই যে ভ্যাট বা কর দিয়েছেন, সেটি সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে কি না এটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ভ্যাট মূলত শুধু বিক্রির ওপর কর নয়; এর কাঠামোর একটি বড় বিষয় হলো ব্যবসার বিভিন্ন ধাপে পরিশোধ করা ইনপুট কর সমন্বয় করা। ছোট ব্যবসার জন্য যদি এমন একটি সরল হার নির্ধারণ করা হয় যেখানে ইনপুট কর সমন্বয়ের সুযোগ না থাকে, তাহলে কাগজে হার কম হলেও বাস্তবে করের চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশের টার্নওভার কর ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও হলো, এ ব্যবস্থায় ব্যবসা ক্রয়ের সময় যে ভ্যাট দেয়, তা সাধারণ ভ্যাট ব্যবস্থার মতো ইনপুট কর হিসেবে সমন্বয় করা যায় না।
অর্থাৎ সরকারের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ শুধু ‘একটি হার’ ঠিক করা নয়; এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ছোট ব্যবসা সহজে নিয়ম মানবে, কিন্তু একই সঙ্গে করের বোঝা অযৌক্তিকভাবে বাড়বে না।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো করের হার নয়, করজাল বাড়ানোর লক্ষ্য। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই খুব কম। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব কৌশলেও সরকার করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং উৎসে কর ও অগ্রিম করের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতার পরিকল্পনা করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান কৌশল অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আয়কর আদায়ের ৮৩ শতাংশ উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর থেকে আসার লক্ষ্য রয়েছে।
এখানে ছোট ব্যবসাগুলোকে আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থায় আনা হলে সরকারের জন্য শুধু নতুন রাজস্বের সুযোগ তৈরি হবে না; অর্থনীতির একটি বড় অংশও ধীরে ধীরে নথিভুক্ত হবে। কে কত বিক্রি করছে, কোন খাতে ব্যবসা বাড়ছে, কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে এসব তথ্য পাওয়া সহজ হবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ, ব্যবসার মূল্যায়ন বা সরকারি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই তথ্য কাজে লাগতে পারে।
তবে এর বিপরীত ঝুঁকিও আছে। করব্যবস্থা যদি ব্যবসায়ীর কাছে শুধু নতুন খরচ হিসেবে হাজির হয়, তাহলে অনেকে বিক্রি কম দেখাতে পারেন বা পুরোপুরি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় থেকে যেতে পারেন। অর্থাৎ করের হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ব্যবসায়ীকে কর দেওয়ার বাইরে থাকার চেয়ে কর দেওয়াকে বেশি সুবিধাজনক করে তোলা।
এই উদ্যোগের সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমানোর বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সাধারণ অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাবও বাজেটে রাখা হয়েছে।
একই সময়ে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, অগ্রিম কর ও উৎসে কাটা করের অর্থ ফেরত বা সমন্বয় পেতে জটিলতা রয়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও ব্যবসায়ী নেতারা করের হার কমানোর পাশাপাশি করব্যবস্থা ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার দাবি জানিয়েছেন।
তাই ছোট ব্যবসার জন্য নতুন ভ্যাট কাঠামো সফল করতে হলে শুধু হার কমানো যথেষ্ট হবে না। নিবন্ধন থেকে রিটার্ন, চালান থেকে কর পরিশোধ পুরো প্রক্রিয়াটিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে একজন ছোট ব্যবসায়ীকে কর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে গিয়ে হিসাবরক্ষক, কাগজপত্র আর দপ্তরে দপ্তরে ঘোরার ওপর নির্ভর করতে না হয়।
শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনার সাফল্য মাপার সহজ একটি উপায় আছে। একজন মুদি দোকানি, ছোট পোশাক ব্যবসায়ী কিংবা ক্ষুদ্র উৎপাদককে জিজ্ঞেস করতে হবে নতুন ব্যবস্থায় আপনার জন্য হিসাব রাখা সহজ হয়েছে কি না, কর দেওয়া সহজ হয়েছে কি না এবং আপনার ব্যবসার প্রকৃত খরচ কতটা বদলেছে।
সরকার যদি এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে যেখানে ছোট ব্যবসায়ী কম জটিলতায় নিয়মিত কর দেন, ভ্যাট ফাঁকি কমে এবং একই সঙ্গে পণ্যের দামে অযাচিত চাপ না পড়ে, তাহলে একক হার করজাল বাড়ানোর কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু শুধু নতুন একটি হার ঘোষণা করে পুরোনো জটিলতা রেখে দিলে ফল উল্টোও হতে পারে।
কারণ ছোট ব্যবসার কাছে করের প্রশ্নটি শুধু সরকারের রাজস্বের প্রশ্ন নয়। এটি তার দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, পণ্যের ক্রয়মূল্য এবং দিনের শেষে হাতে কত টাকা থাকে সেই হিসাবের অংশ। আর সেই জায়গায় সংস্কার সফল না হলে করজাল বড় হলেও অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক পরিসর বড় হবে না।

