ভাবুন, ইউরোপের কোনো কনে যে গাউনটি কিনছেন কয়েকশ ডলার বা তারও বেশি দামে, সেটির সূক্ষ্ম লেস, কর্সেট, ভেইল কিংবা অলংকারের কাজ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায়। পোশাকটির গায়ে লেখা থাকছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। বিষয়টি শুধু একটি কারখানার গল্প নয়; বরং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কোন দিকে এগোতে পারে, তারও একটি ছোট উদাহরণ।
পোশাক যখন শুধু পোশাক থাকে না
নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে জার্মান বিনিয়োগে গড়ে ওঠা ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড মূলত উচ্চমূল্যের ব্রাইডাল পোশাক তৈরি করছে। বিয়ের গাউন ছাড়াও ভেইল, পেটিকোট, বোলেরো, জ্যাকেট, স্যুট, জুতা ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি হচ্ছে এখানে। কোম্পানিটি ২০২২ সালে উৎপাদন শুরু করে।
বাংলাদেশে এ ধরনের বিশেষায়িত ব্রাইডাল পোশাকের দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা জনবল শুরুতে খুব বেশি ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে কর্মীদের নিজেরাই প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে। কারণ সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজারের মতো একটি ব্রাইডাল গাউন তৈরি করা যায় না। কাপড় তুলনামূলকভাবে নরম ও সূক্ষ্ম হওয়ায় সামান্য ভুলেও পুরো পোশাকের মান নষ্ট হতে পারে। তাই উৎপাদনের আগে কয়েক মাস প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় ব্যবসায়িক প্রশ্নটি আসে। আমরা যদি শুধু বেশি সংখ্যক পোশাক বানিয়ে কম দামে বিক্রি করি, তাহলে প্রতিযোগিতায় সব সময়ই কম মজুরি ও বড় উৎপাদন সক্ষমতার দেশগুলোর সঙ্গে লড়তে হবে। কিন্তু একই শ্রমিক যখন জটিল নকশা, সূক্ষ্ম লেস, অলংকরণ ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করেন, তখন একই কেজি কাপড় বা একই ঘণ্টার শ্রম থেকে পাওয়া রপ্তানি আয়ও বাড়তে পারে।
ইউরোপের নকশা, নারায়ণগঞ্জের কারিগরি দক্ষতা
ইউবিএফের বাংলাদেশে আসার পেছনেও রয়েছে উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব। ২০২০ সালে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ কোটি ১৮৭ লাখ ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছিল। পরিকল্পনাটি ছিল পোল্যান্ডের একটি কারখানার উৎপাদনের অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তর করে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উচ্চমূল্যের ব্রাইডাল পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি করা।
অর্থাৎ এখানে শুধু ‘বাংলাদেশে সস্তা শ্রম পাওয়া যায়’ এই পুরোনো গল্পটি পুরোপুরি খাটে না। ইউরোপে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কোম্পানির জন্য বাংলাদেশে উৎপাদন সরিয়ে আনা আকর্ষণীয় হয়, কিন্তু সেই উৎপাদন ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও নির্দিষ্ট মানের কাজ শিখতে হয়। ইউবিএফের ক্ষেত্রেও পোল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষক এনে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের তৈরি ব্রাইডাল পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্য ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে যায় এবং কোম্পানিটি ৫৫টিরও বেশি দেশের বাজারে পণ্য পৌঁছানোর কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল একটি কারখানা থেকে একটি দেশে রপ্তানির গল্প নয়; বাংলাদেশে তৈরি পণ্য ইউরোপীয় সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে।
বিশ্ববাজারও ছোট নয়
এই বাজারকে ছোট কোনো ‘নিশ’ বাজার ভেবে অবহেলা করার সুযোগও নেই। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ওয়েডিং ওয়্যার বা বিয়ের পোশাকের বাজার ২০২৪ সালে প্রায় ৮২.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস, ২০৩০ সালে বাজারটি ১০৯.৯ বিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে। ২০২৫ থেকে ২০৩০ সময়ে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ১৩.৫ শতাংশ। এ বাজারে গাউনই সবচেয়ে বড় পণ্যশ্রেণি, আর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল ২০২৪ সালে মোট বাজার আয়ের ২৭ শতাংশের অংশ নিয়ে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বাজার ছিল।
তবে এখানেই একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি বড় বাজার মানেই বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার হয়ে গেছে, এমন নয়। বাংলাদেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে মূলত বিশেষায়িত উৎপাদন, তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় এবং দক্ষ শ্রমিকের সমন্বয়ে। এই জায়গায় টিকে থাকতে হলে শুধু পোশাক বানালেই হবে না; ডিজাইন, মান নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সরবরাহ, ছোট অর্ডার সামলানো এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বদলানোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
আদমজী ইপিজেডের গল্পটাও বদলে যাচ্ছে
ইউবিএফের উত্থানকে আলাদা করে দেখলে পুরো ছবিটা বোঝা যাবে না। যে জায়গায় একসময় আদমজী জুট মিল ছিল, সেই ২৯২.৬২ একরের জমিতে এখন তৈরি হয়েছে বহুমুখী রপ্তানি শিল্পাঞ্চল। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, আদমজী ইপিজেডে প্রায় ৭৫ হাজার ৭৩৪ জন কর্মরত। এ অঞ্চলে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৮৪৩.০৩ মিলিয়ন ডলার এবং এ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১১.০৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানকার পণ্য শুধু প্রচলিত পোশাকে সীমাবদ্ধ নেই। উচ্চমূল্যের পোশাকের পাশাপাশি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, সেফটি জ্যাকেট, ব্লেজার, সেফটি জুতা, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক পণ্য ও গাড়ির সিট কভারও তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইপিজেডটির ক্রমবর্ধমান রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের তথ্যও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে দেখা যায়।
এই পরিবর্তনের অর্থ খুব সহজ। বাংলাদেশের রপ্তানি যদি শুধু ‘কত বেশি পোশাক বানানো গেল’ এই হিসাবের মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির জায়গা সীমিত হয়ে আসতে পারে। বরং একই কারখানায় বেশি মূল্য সংযোজন করা পণ্য তৈরি হলে কম পরিমাণ পণ্য দিয়েও বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব।
আসল চ্যালেঞ্জ এখানেই
তবে ব্রাইডাল পোশাকের মতো উচ্চমূল্যের বাজারে ঢোকা সহজ নয়। ক্রেতারা এখানে শুধু দাম দেখেন না; পোশাকের ফিটিং, নকশার নিখুঁততা, কাপড়ের মান, সেলাই, অলংকরণ এবং সময়মতো সরবরাহ সবকিছু একসঙ্গে বিচার করেন। একটি বড় অর্ডারের কয়েকটি পোশাকে ত্রুটি থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই ইউবিএফের মতো উদ্যোগকে শুধু ‘নতুন ধরনের পোশাক তৈরি’ হিসেবে দেখলে গল্পের বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। এর আসল গুরুত্ব হলো বাংলাদেশের শ্রমিককে যদি আরও জটিল ও বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্য তৈরিতে দক্ষ করা যায়, তাহলে দেশের রপ্তানি শিল্প ধীরে ধীরে কম দামের প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে বেশি দামের বাজারে যেতে পারে।
আজ নারায়ণগঞ্জে একটি ব্রাইডাল গাউন তৈরি হচ্ছে। আগামী দিনের বড় প্রশ্ন হলো, এমন আরও কত ধরনের পণ্য বাংলাদেশে তৈরি করা সম্ভব যেগুলোর দাম বেশি, দক্ষতার প্রয়োজন বেশি এবং বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়টি শুধু কম খরচের জন্য নয়, ভালো মান ও বিশেষায়িত উৎপাদনের জন্যও পরিচিত হবে।

