বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যে ব্যবধান বহুদিনের। চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এই ভারসাম্য বদলাতে শুধু রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা নয়, বরং চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশি ব্যবসার সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদনে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
ঢাকার মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি)-এর একটি চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে যৌথ বিনিয়োগ করা গেলে বাণিজ্য বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও সম্পর্কটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো আমদানি-নির্ভরতা। সাম্প্রতিক বাণিজ্য তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ চীন থেকে যন্ত্রপাতি, তুলা, ইলেকট্রনিকস, শিল্পের কাঁচামালসহ বিপুল পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, মাছ ও কিছু কৃষিপণ্যকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ সরকারের বেইজিং মিশনও বলছে, চীন থেকে আসা কাঁচামালের একটি বড় অংশ দেশে প্রক্রিয়াজাত হয়ে আবার তৃতীয় দেশের বাজারে রপ্তানি হয়।
এখানেই যৌথ বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চীনা প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে উৎপাদনে যুক্ত হয়, তাহলে শুধু চীনা বাজারে পণ্য পাঠানোর সুযোগ নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পথটি কেবল ‘চীন থেকে কম আমদানি’ নয়; বরং ‘বাংলাদেশে বেশি উৎপাদন এবং বেশি রপ্তানি’ করার দিকেও যেতে পারে।
বৈঠকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। এসব খাতের বেশ কয়েকটিকেই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ-সম্ভাবনা বিশ্লেষণেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
পাটের ক্ষেত্রটিও আলাদা করে নজর দেওয়ার মতো। এর আগে চীনের এক্সিম ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশে পাট, সবুজ প্রযুক্তি, বস্ত্র ও ওষুধ খাতে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে পাট থেকে জ্বালানি, সার ও প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্য তৈরিতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছিল।
চীনের বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হলেও সেখানে ঢুকতে শুধু শুল্ক সুবিধা যথেষ্ট নয়। মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, প্যাকেজিং, খাদ্য নিরাপত্তা, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মান এবং বাজার সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের জ্ঞান সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট, মাছ, চামড়া, জুতা ও কৃষিপণ্যেরও সুযোগ রয়েছে।
দুই দেশ এরই মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। চীন বাংলাদেশি পাট, সামুদ্রিক পণ্য, চামড়া ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, নতুন জ্বালানি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পোশাক ও অন্যান্য উৎপাদন খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি চীনা বিনিয়োগ বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কারখানা করেও যদি উৎপাদনের অধিকাংশ কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি চীন থেকে আমদানি করে এবং পণ্য মূলত অন্য বাজারে পাঠায়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে ঠিকই, কিন্তু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের হিসাবের ওপর প্রভাব সীমিত হতে পারে।
তাই যৌথ বিনিয়োগের আসল সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশে কতটা মূল্য সংযোজন হচ্ছে তার ওপর। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এবং চীনের বাজারে তৈরি পণ্যের সরাসরি রপ্তানি এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগটি শুধু মূলধন আনবে না, রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়াবে। এ কারণেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু ‘পণ্য কেনাবেচা’র মধ্যে না রেখে উৎপাদন ও শিল্প সহযোগিতার দিকে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
চীনা প্রতিনিধিদলের সদস্য হে তাও, হংহে অঞ্চলের বাণিজ্য ব্যুরোর পরিচালক, দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহের কথা জানান। আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ খোঁজার বিষয়েও তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন। এর ফলে এখন দেখার বিষয়, বৈঠকের আলোচনা কতটা বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেয়। কারণ বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে টেকসই পথ সম্ভবত শুধু বেশি বিক্রি করা নয় চীনা পুঁজি, প্রযুক্তি ও বাজারকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে এমন পণ্য তৈরি করা, যার ক্রেতা চীনসহ বিশ্বের বড় বাজারগুলোতে রয়েছে।

