ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশ আমদানির জন্য জারি করা ১০৩টি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বাতিল করায় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর এনওসিগুলো বাতিল করা হয়। আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের চিঠি পাওয়ার পর থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় ইলিশের আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। যদিও হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি মৎস্য অধিদপ্তর, তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, আমদানি করা ভারতীয় ইলিশকে পদ্মার ইলিশ বলে চড়া দামে বিক্রির প্রতারণা, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদনে জেলেদের আগ্রহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বেড়ে গিয়েছিল। আমদানির সময় প্রতি কেজি ইলিশের ঘোষিত মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৮ সেন্ট থেকে ২ ডলার পর্যন্ত। কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। অথচ মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৫৩৫ মেট্রিক টন ইলিশ বেনাপোল দিয়ে দেশে ঢুকেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কেজি প্রায় ৫০০ টাকার মধ্যে আমদানি করা এই ইলিশ বাজারে পদ্মার ইলিশ হিসেবে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যশোর শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, আমদানিকৃত ভারতীয় ইলিশ দেখতে অনেকটা পদ্মার ইলিশের মতো হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। স্বাদে পার্থক্য থাকলেও বাহ্যিকভাবে মিল থাকায় ক্রেতারা দেশি ইলিশ ভেবে ভারতীয় ইলিশ কিনছেন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন বাজার তদারকির সময় চড়া দামে ভারতীয় ইলিশ বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন বিক্রেতাকে জরিমানা করেছে।
হঠাৎ করে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন আমদানিকারকরা। ইলিশ আমদানিকারক সৈয়দ মহিদুল হক রুবাই বলেছেন, ‘হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ করায় আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।’ তিনি জানান, আমদানির উদ্দেশ্যে ভারতের অংশে তাদের ক্রয় করা ইলিশ রাখা হয়েছিল। এখন সেগুলো কম দামে ফেরত দিতে হবে। এর পাশাপাশি আমদানি খরচেরও লোকসান গুনতে হবে। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, অনাপত্তি সনদ পাওয়ার পর ভারতীয় অংশে মাছ কেনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন হঠাৎ করে সনদ বাতিল করে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি মনে করেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমদানিকারকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বেনাপোলের মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ইলিশ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে এবং এর ফলে বেনাপোলের বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহও বন্ধ রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরও বড় একটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দাম দেখিয়ে ইলিশ আমদানি করা হলে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইনভয়েস ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক-কর আরোপ করা হয়, যার ফলে আমদানিতে কম দাম দেখানো হলে রাজস্ব আদায় কম হয় এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়। এছাড়া বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দেশীয় ইলিশ আহরণে জেলেদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজারে ইলিশের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ভারত থেকে আর কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না।
এই সিদ্ধান্তের একটি কূটনৈতিক মাত্রাও রয়েছে। আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মৎস্য আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কলকাতার ‘ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বাংলাদেশ সরকারের কাছে চিঠি দিয়ে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানায়। এছাড়া কলকাতার ‘ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার এই অনুরোধে সাড়া দেয়নি, বরং উল্টো ভারত থেকে ইলিশ আমদানির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে গত আগস্ট মাসে ভারতের গুজরাট থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে মৎস্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে এই আমদানি বন্ধ করা হয়।
আমদানি বন্ধের ফলে স্বল্পমেয়াদে দেশীয় বাজারে ইলিশের দাম আরও বাড়তে পারে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে দেশীয় জেলেদের ইলিশ আহরণে উৎসাহ বাড়লে এবং প্রজনন মৌসুমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল হতে পারে। তবে বর্তমানে বাজারে ইলিশের দাম ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী। পদ্মার ইলিশ এখন ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে একই আকারের ভারতীয় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছিল ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। আমদানি বন্ধ হলে দেশীয় ইলিশের চাহিদা আরও বাড়বে এবং দাম আরও বাড়তে পারে। মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অবশিষ্ট অনুমোদনের আওতায় ইলিশ আমদানি হবে কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সিদ্ধান্তে অটল থাকে কি না এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

