বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির কথা উঠলে সাধারণত টি-শার্ট, ট্রাউজার বা সোয়েটারের কথাই সামনে আসে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় তৈরি হচ্ছে এমন পোশাক, যার প্রতিটি ধাপে দরকার আলাদা দক্ষতা। ইউনিভার্সাল মেন্সওয়্যার লিমিটেড এর কারখানা থেকে বছরে প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলারের পুরুষদের স্যুট, ব্লেজার ও ফরমাল পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে।
রোমানিয়া-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সাল থেকে আদমজী ইপিজেডে উৎপাদন করছে। কারখানাটিতে পুরুষদের স্যুট, ব্লেজার, ফরমাল ট্রাউজার, ওয়েস্টকোট ও জ্যাকেট তৈরি হয়। কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি আয় ছিল ৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে শুধু বিপুল পরিমাণ পোশাক নয়, তুলনামূলক উচ্চমূল্যের ফরমালওয়্যারও বিশ্ববাজারে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ও রপ্তানি কার্যক্রমের অস্তিত্ব বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যেও পাওয়া যায়।
স্যুট তৈরির বাজারে বাংলাদেশের নতুন জায়গা
এই ব্যবসার বিশেষত্ব শুধু রপ্তানির অঙ্কে নয়, পণ্যের ধরনেও। একটি সাধারণ টি-শার্টের তুলনায় স্যুট বা ব্লেজার তৈরিতে কাপড় কাটিং, সেলাই, প্রেসিং, ফিটিং ও ফিনিশিংয়ের প্রতিটি ধাপে বেশি নিখুঁততা প্রয়োজন। ফলে এ ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলে বাংলাদেশের পোশাক খাত কম দামের পণ্যের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে।
ইউনিভার্সাল মেন্সওয়্যার প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল এই লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশি আনন্তা গ্রুপ ও রোমানিয়ার টাইম ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিংয়ের যৌথ উদ্যোগ হিসেবে গড়ে ওঠে। পুরোনো শিল্পতথ্যে দেখা যায়, শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল পুরুষদের ফাইন টেইলার্ড স্যুট, জ্যাকেট ও ট্রাউজার তৈরি করে রপ্তানি করা। সময়ের সঙ্গে এর উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার পরিধি বেড়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ক্রেতাদের তালিকায় এইচঅ্যান্ডএম, জারা, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, প্রাইমার্ক, এএসওএস, জ্যাক অ্যান্ড জোন্স, বেন শেরম্যানসহ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নাম রয়েছে বলে কোম্পানি ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্যসূত্রে পাওয়া যায়।
শুধু বড় কারখানা নয়, বড় রপ্তানি সক্ষমতার পরীক্ষাও
কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে প্রায় ৫ লাখ বর্গফুটের বেশি জায়গাজুড়ে উৎপাদন অবকাঠামো রয়েছে এবং মাসে প্রায় ৫ লাখ পিস ট্রাউজার, ব্লেজার ও অন্যান্য পুরুষ পোশাক তৈরির সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট প্রকাশনায় মাসিক স্যুট উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখের কাছাকাছি বলা হয়েছে। তাই পণ্যের ধরনভেদে উৎপাদন সক্ষমতার হিসাব আলাদা হতে পারে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পোশাক কারখানার সক্ষমতা শুধু কতটি পোশাক তৈরি হচ্ছে তা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কোন ধরনের পোশাক তৈরি হচ্ছে, তার মূল্য কত, কতটা স্থানীয় মূল্য সংযোজন হচ্ছে এবং কতটা বিদেশি কাঁচামাল ব্যবহার করতে হচ্ছে রপ্তানি আয়ের প্রকৃত অর্থ বুঝতে এসব বিষয়ও দেখতে হয়। ইউনিভার্সাল মেন্সওয়্যারের ক্ষেত্রে বড় অংশের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আসে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় পুরোপুরি দেশের ভেতরে তৈরি মূল্য নয়; এর একটি অংশ কাঁচামাল আমদানির পেছনেও ব্যয় হয়।
এখানেই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বড় প্রশ্নটি আসে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো, নাকি রপ্তানিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনও বাড়ানো? স্যুটের মতো অপেক্ষাকৃত জটিল পোশাক উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে কাপড়, ইন্টারলাইনিং, বোতাম, লেস, প্যাকেজিংসহ আরও বেশি উপকরণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে একই রপ্তানি আয়ের বিপরীতে দেশের ভেতরে ধরে রাখা মূল্য বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
আদমজী ইপিজেডের গল্পটাও বদলাচ্ছে
ইউনিভার্সাল মেন্সওয়্যারের সাফল্যকে শুধু একটি কারখানার গল্প হিসেবে দেখলে এর বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। আদমজী ইপিজেড এখন এমন একটি শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রচলিত পোশাকের পাশাপাশি তুলনামূলক বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও আদমজী ইপিজেডে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের উপস্থিতি দেখা যায়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডের ৪৭টি প্রতিষ্ঠান মিলে ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কয়েকটি কারখানা উৎপাদনে এলে এ রপ্তানি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে একটি কারখানার প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়কে ইপিজেডের বৃহত্তর রপ্তানি কাঠামোর অংশ হিসেবেও দেখা যায়।
আরেকটি বিষয়ও নজরে পড়ার মতো। বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পোশাকের উৎস খুঁজছে না; সরবরাহের স্থায়িত্ব, উৎপাদনের মান, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং কার্বন নিঃসরণও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউনিভার্সাল মেন্সওয়্যার ২০২৩ সালে লিড গোল্ড সনদ পাওয়ার পাশাপাশি ২০২৫ সালে ৮১৪ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করেছে। কোম্পানির হিসাবে এই ব্যবস্থা বছরে প্রায় ৯৫০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আনুমানিক ৬৩৭ টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সামনে এখন তাই শুধু বেশি পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য থাকলে চলবে না। টি-শার্ট ও সাধারণ পোশাকের বাইরে স্যুট, ব্লেজার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল পোশাক কিংবা অন্য উচ্চমূল্যের পণ্যে কতটা জায়গা তৈরি করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জের এই কারখানা দেখাচ্ছে, সেই বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পেতে হলে দক্ষ শ্রমিক, স্থানীয় কাঁচামাল, ডিজাইন সক্ষমতা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এই চার জায়গায় একসঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

