বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগে ঢাকায় এসেছে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল। বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিল্প সহযোগিতার নতুন সুযোগ খুঁজতে ১৭-১৯ আগস্ট তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছে ভারতের শিল্প খাতের ১৮ সদস্যের একটি দল।
সোমবার ঢাকায় পৌঁছানো প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতের শিল্প কনফেডারেশনের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। দলে ভারতের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, মাহিন্দ্রা গোষ্ঠী, অ্যাপোলো হাসপাতাল, ভারত বায়োটেক, গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের প্রতিনিধিরা।
এই সফরকে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য নিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হলেও ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়ে সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা চলছে।
সরকারি পর্যায়ে হবে একাধিক বৈঠক
সফরকালে ভারতীয় প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে। আলোচনায় থাকবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
এসব বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ভারতের বাজার আরও উন্মুক্ত করা এবং বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরকারি পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন তাদের সম্মানে একটি যৌথ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছে। সেখানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বাস্তব সমস্যাগুলোও সামনে আসতে পারে।
রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসা মেলাতে চান না ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়া উচিত নয়।
তার মতে, ব্যবসায়িক সম্পর্ককে রাজনীতির বাইরে রাখাই উভয় দেশের জন্য ভালো। কারণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যোগাযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলো ধরে রাখা প্রয়োজন।
ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় দেশটির বাজারকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা, বড় অর্থনীতি এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ফজলুল হক বলেন, দুই দেশের মধ্যে কখনো মতপার্থক্য বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলেও নিয়মিত সফর ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ সেই দূরত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ভারতীয় বিনিয়োগেও নজর
শুধু পণ্য রপ্তানি নয়, বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় আসছে।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সফরে বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ এবং দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা পরিচালনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। শিল্প, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলের দৃষ্টিতে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়লে শুধু মূলধনই আসবে না, এর সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং নতুন বাজারের সংযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, বাণিজ্যিক বাধা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কমাতে না পারলে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
বাণিজ্য বাধা নিয়ে উদ্বেগ
দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের সামনে অবশ্য কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতের আরোপ করা কিছু শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা নতুন চাপের মুখে পড়ছেন।
পাটজাত পণ্য, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, তৈরি পোশাক এবং স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ ও বাণিজ্যিক বাধার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ ভারত বিশাল বাজার হলেও সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ যত সহজ হবে, রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগও তত বেশি তৈরি হবে।
ফজলুল হকের মতে, বাণিজ্যের পথে যত কম বাধা থাকবে, দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক তত বেশি সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বাণিজ্যে বড় ব্যবধান
পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য সম্পর্কে এখনো বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানি করেছে ৯.১৫ বিলিয়ন ডলারের, বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের আমদানি ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
এই জায়গায় নতুন প্রতিনিধিদলের সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সরাসরি ব্যবসায়িক আলোচনার মাধ্যমে কোন পণ্য ভারতে বেশি সম্ভাবনাময়, কোথায় শুল্ক বা অশুল্ক বাধা রয়েছে এবং কীভাবে রপ্তানি বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা করা সম্ভব।
ভারতীয় বিনিয়োগের অবস্থান কোথায়?
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান উল্লেখযোগ্য হলেও আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮৮৭.৮১ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৩২.৮৩ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজার, শিল্পায়নের সম্ভাবনা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এখানে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসার সম্প্রসারণেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত করতে হলে শুধু ব্যবসায়ী সফর যথেষ্ট নয়। নিয়মিত আলোচনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, বাণিজ্য বাধা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিরতা দরকার।
সামনে বড় সুযোগ, তবে বাধাও আছে
বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভৌগোলিক নৈকট্য। দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন তুলনামূলকভাবে সহজ করা সম্ভব। কাছাকাছি বাজার হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও অনেক দূরের বাজারের তুলনায় কম রাখা যায়।
কিন্তু এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সীমান্ত বাণিজ্য, স্থলবন্দর, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং পণ্য পরিবহনের জটিলতা কমাতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ভারতের বড় বাজারে প্রবেশের জন্য মান, প্যাকেজিং, সরবরাহের সময় এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের দিকেও নজর দিতে হবে।
ভারতের দিক থেকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সফরটি কতটা ফলপ্রসূ হবে?
ভারতের শিল্প কনফেডারেশনের ১৮ সদস্যের প্রতিনিধিদলের ১৭-১৯ আগস্ট সফর তাই নিছক একটি ব্যবসায়ী সফর নয়। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এই সফর থেকে পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো ভারতীয় বাজারে রপ্তানি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে ভারতীয় বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী খাতে কাজে লাগানো। আর ভারতের জন্য বাংলাদেশ হতে পারে বড় ভোক্তা বাজার এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বাণিজ্য বাধা এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি দূর না হলে সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।
শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের বার্তাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বাণিজ্যের দরজা বন্ধ করা উচিত নয়। নিয়মিত যোগাযোগ, কম বাধা এবং পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া গেলে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য নতুন পরিসরে যেতে পারে।

