বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্য বলছে, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কর শনাক্তকরণ নম্বর নেই। অর্থাৎ কোটি কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসা, পারিবারিক উদ্যোগ ও ছোট প্রতিষ্ঠান এখনো কর শনাক্তকরণ ব্যবস্থার আওতায় আসেনি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কর শনাক্তকরণ নম্বর না থাকা সব প্রতিষ্ঠানই কর ফাঁকি দিচ্ছে বা তাদের সবার কর দেওয়ার মতো আয় রয়েছে। কর শনাক্তকরণ নম্বর মূলত একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর-পরিচয় নির্ধারণের একটি ব্যবস্থা। কোনো প্রতিষ্ঠানের এই নম্বর থাকতে পারে, কিন্তু তার আয় বা কর্মকাণ্ডের ধরন অনুযায়ী হয়তো কোনো কর দিতে হবে না।
তারপরও এত বিপুলসংখ্যক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কর শনাক্তকরণ নম্বর না থাকা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে—কর দেওয়ার যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করতে পারছে?
১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ।
এর মধ্যে মাত্র ১০ লাখ ২২ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ১২টির মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের কর শনাক্তকরণ নম্বর রয়েছে।
অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের এমন নম্বর নেই।
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি বুঝতে এই পরিসংখ্যানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থনীতি বলতে শুধু বড় কারখানা, ব্যাংক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বোঝায় না। গ্রামের ছোট মুদি দোকান, বাড়ির পাশে ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফেরিওয়ালা, পারিবারিক উদ্যোগ, ছোট কারখানা—সব মিলিয়েই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিশাল অংশ গড়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক শুমারিতে এসব কর্মকাণ্ডকে হিসাবের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে প্রথমবারের মতো দেশের অর্থনীতির তৃণমূল পর্যায়ের একটি বড় চিত্র সামনে এসেছে।
ছোট দোকান থেকে বড় অর্থনীতি
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের আবুল কালাম আজাদ একটি ছোট মুদি দোকান চালান। বাড়ির পাশে প্রায় ৩৫ বর্গফুট জায়গায় তার দোকান। সেখানে চাল, বিস্কুট, কোমল পানীয়, বেকারি পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন।
তার মতো অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে কর শনাক্তকরণ নম্বর এখনো দৈনন্দিন ব্যবসার প্রয়োজনীয়তার অংশ হয়ে ওঠেনি। এমনকি এই নম্বর কী এবং তার ব্যবসার জন্য এটি প্রয়োজন কি না—সেটিও অনেকের জানা নেই।
এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, দেশের কর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু করের হার বা কর আইন নয়। বরং অর্থনীতির বিশাল অনানুষ্ঠানিক অংশকে কীভাবে সহজ ও কার্যকরভাবে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আনা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতির মূল ভিত্তি ক্ষুদ্র উদ্যোগ
অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ কুটির উদ্যোগ, ৬৬ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোগ, প্রায় ৫ লাখ ছোট ব্যবসা এবং মাত্র ৪০ হাজার মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এই হিসাব থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি কতটা ক্ষুদ্র ও পারিবারিক উদ্যোগনির্ভর।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ছোট ব্যবসা ও পারিবারিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে কর কর্তৃপক্ষের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ব্যবসা শনাক্ত করা এবং তাদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনা সহজ নয়।
তবে এখানেই রয়েছে বড় সম্ভাবনাও। যদি করযোগ্য আয় রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় এবং তাদের জন্য সহজ কর ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তাহলে সরকারের রাজস্বের পরিধি বাড়তে পারে।
কর শনাক্তকরণ নম্বর নেই মানেই কর ফাঁকি নয়
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কর শনাক্তকরণ নম্বর নেই বলেই সেটি কর ফাঁকি দিচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
কারণ কর শনাক্তকরণ নম্বর একটি পরিচয় ব্যবস্থা। কর দিতে হবে কি না, তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যবসার ধরন ও প্রযোজ্য আইনের ওপর।
তাই সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—এই ১ কোটি ৭ লাখ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কারা কর শনাক্তকরণ নম্বর নেওয়ার যোগ্য, কারা করযোগ্য এবং কারা করের আওতার বাইরে থাকার কথা—তা সঠিকভাবে আলাদা করা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, এত বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কর শনাক্তকরণ নম্বর না থাকা কর ব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, সব প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনা প্রয়োজনীয় নয়; বরং যাদের কর দেওয়ার যোগ্যতা রয়েছে, তাদের শনাক্ত করাই মূল বিষয়।
কর-জিডিপি অনুপাতও উদ্বেগজনক
করজালের এই সীমাবদ্ধতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় দেশের সামগ্রিক রাজস্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনীয় অনেক দেশের তুলনায় দীর্ঘদিন ধরেই কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অনুপাত নেমে এসেছে ৬.৭৩ শতাংশে, যেখানে এর আগের অর্থবছরে ছিল ৭.৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে সরকার ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০.৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু বড় করদাতাদের ওপর নির্ভর করে এগোনো কঠিন হবে। অর্থনীতির বিস্তৃত অংশকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা, কর ফাঁকি কমানো এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বরের অবস্থা আরও দুর্বল
কর শনাক্তকরণ নম্বরের চেয়েও ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বরের পরিস্থিতি আরও দুর্বল।
অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৩ লাখ ৮২ হাজার, অর্থাৎ ৩.৩ শতাংশের ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর রয়েছে।
স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই হার ৫.৯ শতাংশ। আর অস্থায়ী ৫ লাখ ৭৩ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ৭৮১টির ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর রয়েছে।
এখানেও মূল সমস্যা একই—অর্থনীতির বিশাল ক্ষুদ্র ও অস্থায়ী অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক কাঠামোর বাইরে।
অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য
দেশের সব অঞ্চলে কর শনাক্তকরণের পরিস্থিতিও এক নয়।
রাজধানী ঢাকায় কর শনাক্তকরণ নম্বরের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের হার সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম।
অন্যদিকে উত্তরের জেলা রংপুরে পরিস্থিতি অনেক দুর্বল। সেখানে মোট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৪ শতাংশের কর শনাক্তকরণ নম্বর রয়েছে।
এই আঞ্চলিক পার্থক্য দেখিয়ে দেয়, একই ধরনের করনীতি দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। রাজধানী ও বড় শহরের ব্যবসায়ীরা যেখানে ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ ও সরকারি সেবার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি যুক্ত, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় অংশ এখনো নগদ লেনদেন ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
রাজস্ব বোর্ডের নজরদারি বাড়ছে
করজাল সম্প্রসারণের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর জরিপ ও পরিদর্শন বিভাগের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং কর-অনুবর্তিতা নিশ্চিত করার কাজ নিয়মিতভাবে চলছে।
কর শনাক্তকরণ নম্বরের পাশাপাশি আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণপত্র যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ ধরনের সেবা ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব নথি যাচাই আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে জরিপ বাড়ানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের তিনটি জেলায় নতুন কর কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শুধু করের আওতায় আনলেই হবে না
তবে করজাল বাড়ানোর উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করলেই হবে না। কর ব্যবস্থাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও কম ব্যয়বহুল করাও জরুরি।
একজন গ্রামের মুদি দোকানি বা ছোট উদ্যোক্তার কাছে জটিল কাগজপত্র, হিসাবরক্ষণ কিংবা বারবার সরকারি দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন তৈরি হলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থাকতে চাইতে পারেন।
তাই কর ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সহজ নিবন্ধন, সহজ রিটার্ন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। করকে শুধু সরকারি অর্থ আদায়ের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং কর দেওয়ার বিনিময়ে ব্যবসায়ীরা কী ধরনের সেবা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা পান—সেটিও দৃশ্যমান করতে হবে।
বড় প্রশ্ন রাজস্ব নয়, আস্থার
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোটি কোটি মানুষের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পারিবারিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ যদি সরকারি পরিসংখ্যান ও কর ব্যবস্থায় পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও কাঠামো বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই করজাল সম্প্রসারণের লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্বিচারে সবাইকে করের আওতায় আনা নয়। বরং যারা কর দেওয়ার যোগ্য, তাদের শনাক্ত করা; যারা কর দিচ্ছেন, তাদের জন্য ব্যবস্থা সহজ করা; আর যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেন, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশের রাজস্ব আয় বাড়াতে এই ভারসাম্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করজাল যত বড় হবে, ততই সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও জনসেবার জন্য নিজস্ব অর্থের জোগান বাড়বে। কিন্তু সেই সম্প্রসারণ যদি অতিরিক্ত চাপ, জটিলতা ও হয়রানির মাধ্যমে করা হয়, তাহলে ছোট ব্যবসাগুলো আরও অনানুষ্ঠানিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
সুতরাং সামনে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—অর্থনীতির তৃণমূলকে ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থা তৈরি করে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা।

