বাংলাদেশের সমুদ্র থেকে মাছ আহরণের পরিমাণ গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি এখনো আশানুরূপ নয়। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ইলিশ আহরণে নেমেছে বড় ধরনের ধস। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক জাহাজে ৮ হাজার ১৩৮ টন ইলিশ আহরণ হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮২৩ টনে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণ কমেছে ৭৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই তথ্য প্রকাশ করেছে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর।
সামগ্রিক মাছ আহরণের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টনে। তবে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৮ টনে। এক বছরের ব্যবধানে আহরণ বেড়েছে ১৩ হাজার ২৮ টন বা ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরের রেকর্ডের তুলনায় এখনও তা ১৬ হাজার ৩৫৮ টন কম।
সমুদ্র থেকে মাছের প্রজাতি কমে যাওয়াটা আরও বড় উদ্বেগের বিষয়। দুই-তিন দশক আগেও দেশের সমুদ্র থেকে প্রায় ১২০ প্রজাতির মাছ আহরণ করা হতো। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৫০টিতে। এর মানে, সমুদ্রের জলসীমা যেমন বড়, মাছের বৈচিত্র্য তেমনই কমছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাছের মজুদ কমে যাওয়া, সমুদ্রদূষণ, জেলিফিশের আধিক্য এবং নতুন বিনিয়োগের অভাবে এ খাতের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সার্ডিন মাছের আহরণেও বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫০ হাজার ৭৮৩ টন সার্ডিন আহরণ হয়েছিল। সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ১৩৫ টনে। চিংড়ির আহরণ অবশ্য কিছুটা বেড়েছে – গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টাইগার, হোয়াইট ও ব্রাউন জাতের চিংড়ি আহরণ হয়েছে ৩ হাজার ৪৭৭ টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরী বলছেন, ‘সমুদ্রে সর্বশেষ ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত দুই থেকে আড়াই মাসে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মাত্র ১৪ দিন মাছ ধরতে পেরেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে জেলিফিশের আধিক্যের কারণে মাছ ধরা যায় না। বছরে বিভিন্ন কারণে প্রায় ছয় মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকে।’
বর্তমানে প্রায় ২৭০টি বাণিজ্যিক জাহাজ মাছ ধরার অনুমতি পেলেও নিয়মিত মাছ আহরণে যাচ্ছে ২৩২টি। বাকি ৩৮টি জাহাজ মালিকানা জটিলতা, আর্থিক সংকট ও জনবল সংকটের কারণে সমুদ্রে যেতে পারছে না। নিয়মিত যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে স্টিলের ১৭০টি ও কাঠের ৬২টি।
একটি বাণিজ্যিক জাহাজ একবার মাছ ধরতে গেলে ২৫ দিনে জ্বালানি, খাবার, বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু সমুদ্রে গিয়ে এখন আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিপুল ব্যয় এর বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। নতুন জাহাজ নির্মাণ ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি এ খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রযোজন হলেও তা হচ্ছে না।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসাইন সাগর বলেছেন, ‘সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ সর্বশেষ অর্থবছরে কিছুটা বেড়েছে। তবে মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মাছের মজুদ বাড়াতে সব মাছ আহরণ করা ঠিক নয়। মাছ আহরণ হঠাৎ কমে বা বেড়ে যাওয়াও ভালো লক্ষণ নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের মাছের মজুদ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা গেলে কতটুকু মাছ ধরা যাবে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব। পাশাপাশি সমুদ্রদূষণ কমানো, জেলিফিশের আধিক্য রোধ করা এবং অবৈধ নৌযান নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। ইলিশের মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া শুধু জেলেদের নয়, পুরো দেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।

