গত ২৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি। প্রথম কার্যদিবসেই নতুন লোগো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ)-কে একীভূত করে এই নতুন সংস্থা গঠন করা হয়েছে। ২০ আগস্ট প্রকাশিত গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ কার্যকর হয়, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির গল্প শুরু হয় আজ থেকে নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলোতে, যখন দেশের অর্থনৈতিক দর্শন গঠিত হচ্ছিল।
ন্যাশনালাইজেশন থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ
১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করে। ওই বছর বাংলাদেশ শিল্প উদ্যোগ (ন্যাশনালাইজেশন) আদেশ জারি করে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয় এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্পোরেশন গঠন করা হয়। তবে এই নীতি স্থায়ী ছিল না।
১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে দেশের প্রথম শিল্প ও বিনিয়োগ নীতি প্রণীত হয়, যেখানে মাধ্যম ও ক্ষুদ্র শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়, সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে এসব শিল্পের ওপর ১০ বছরের জন্য জাতীয়করণ স্থগিত রাখা হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়।
পরবর্তীকালে এই নীতি আরও উদার করা হয়। ১৯৭৩ সালে বেসরকারি বিনিয়োগের সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয় এবং ১৯৭৪ সালের নতুন বিনিয়োগ নীতিতে তা ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। বিদেশি অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানো হয়।
বিনিয়োগ প্রণোদনা প্রতিষ্ঠানের উত্থান
বাংলাদেশ যখন ধীরে ধীরে বেসরকারি উদ্যোগের জন্য জায়গা তৈরি করছিল, তখন বিনিয়োগ সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে। ১৯৮৯ সালের বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট (বিওআই) আইনের মাধ্যমে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রচার ও সহায়তার প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
একই সময়ে আরেকটি প্রক্রিয়া চলছিল, বাণিজ্যিক উদ্যোগ থেকে রাষ্ট্রের ধীরে ধীরে প্রত্যাহার।
ডিসইনভেসমেন্ট বোর্ড থেকে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন
১৯৭৪ সালে ডিসইনভেসমেন্ট বোর্ড গঠন করা হয়। ১৯৮০-এর দশকে এবং বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে বেসরকারিকরণ উদ্যোগ গতি পায়। ১৯৯৩ সালে প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড গঠিত হয় রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ বেসরকারি খাতে হস্তান্তর ত্বরান্বিত করতে। ২০০০ সালে এই বোর্ডটি প্রাইভেটাইজেশন কমিশনে রূপান্তরিত হয়।
ফলে সমান্তরালভাবে দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে থাকে, বিওআই বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ আনতে, আর প্রাইভেটাইজেশন কমিশন রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগকে বেসরকারি খাতে নিতে। শেষ পর্যন্ত এই বিভাজন অদক্ষ প্রমাণিত হয়।
২০১৬: বিওআই ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশন একীভূত হয়ে বিডা
সরকার বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে একীভূত করে বিডা গঠন করে। ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিডার যাত্রা শুরু হয়। বিডার নিজস্ব ঐতিহাসিক দলিলও এই একীভবনের কথা নিশ্চিত করে।
তবে বিডা সব বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। ততদিনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিমণ্ডল আরও জটিল হয়ে উঠেছিল।
নতুন অর্থনীতির জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান
২০১০ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন বেজার আইনি ভিত্তি তৈরি করে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, লাইসেন্স, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পায় বেজা। এর লক্ষ্য ছিল শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি ত্বরান্বিত করা।
পরিকাঠামোতে নতুন প্রতিষ্ঠান
২০১০ সালে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পিপিপি অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৫ সালের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ আইন পিপিপি অথরিটির জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করে, যা পূর্ববর্তী অফিসকে প্রতিস্থাপন করে। এই আইন পিপিপিকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে।
গত দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ নিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছিল, বিনিয়োগ প্রচার ও সহায়তায় বিডা, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেজা এবং পাবলিক-প্রাইভেট পরিকাঠামোতে পিপিপিএ।
২০২৬: তিনে এক
বিডা নিজেই একীভবনের মাধ্যমে গঠিত হওয়ার এক দশক পর সরকার আবারও প্রতিষ্ঠানিক একত্রীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সংসদে ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল পাস হয়, যা বিডা, বেজা ও পিপিপিএ-কে একীভূত করার পথ তৈরি করে। উদ্দেশ্য ছিল খণ্ডিতকরণ কমানো ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত সেবা প্ল্যাটফর্ম প্রদান করা। ২০ আগস্ট থেকে নতুন আইন কার্যকর হয়।
নতুন অথরিটি এখন বিনিয়োগ প্রচার, নিবন্ধন, অনুমোদন, প্রণোদনা, শিল্পাঞ্চল ও পিপিপি-সংক্রান্ত সেবার জন্য একটি একক প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করবে।
যাত্রা কি শেষ?
ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক ও প্রতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সর্বশেষ ফল। যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতীয়করণ থেকে, অতঃপর বেসরকারি বিনিয়োগ, ডিসইনভেসমেন্ট থেকে প্রাইভেটাইজেশন, বিনিয়োগ প্রচার থেকে উন্নয়ন, এবং শেষ পর্যন্ত সমন্বিত বিনিয়োগ সহায়তার দিকে।
এবং এটাই চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠানিক গন্তব্য বলে ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার বদলায়। বিনিয়োগের ধরন বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বদলায়। সরকার নিজেও বদলায়। তাই একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সেবা দিতে তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একসময় অন্য বাস্তবতার জন্য পুনর্নকশা করতে হয়।

