ডাঙ্গা বাজার সেতুর সমীক্ষা ও নকশার একটি অনুদানভিত্তিক প্রকল্পে পুরো অর্থই পরামর্শক খাতে রাখার প্রস্তাব উঠেছে। দাতা দেশ স্পেনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই এই অর্থ ব্যয় করবে। ছোট বা সমীক্ষা প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পরামর্শকের জন্য রাখার নজির আছে। কিন্তু শতভাগ বরাদ্দ রাখার ঘটনা বিরল। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পটির নাম ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স প্রজেক্ট ফর ডিটেইলড ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড ডিজাইন অব ডাঙ্গা বাজার ব্রিজ’। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) প্রস্তাবটি কমিশনে পাঠিয়েছে। কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১ কোটি ২৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এটি টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রকল্প প্রস্তাব (টিএপিপি)। পুরো অর্থই অনুদান হিসেবে দেবে স্পেনের সরকারি আর্থিক তহবিল স্প্যানিশ এফআইইএম। বাস্তবায়নকাল প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভা হয়। সেখানে পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আলোচনায় বলা হয়, পরামর্শকের সংখ্যা আরও যৌক্তিক হওয়া দরকার। টিএপিপির সঙ্গে দেওয়া ক্রয়পরিকল্পনাও যথাযথ হয়নি। তাই পরামর্শকের সংখ্যা ও ধরন যুক্তিসংগত করে প্রকল্প পুনর্গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুসরণ করে ক্রয়পরিকল্পনা করতে হবে। নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, দেশের স্বার্থেই এটি করতে হবে। তাঁর জ্ঞানে যা ভালো মনে হয়েছে, সেসব বিষয়েই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কমিশন বলছে, টিএপিপি নীতিগতভাবে অনুমোদনযোগ্য। তবে ভবিষ্যতে এর সূত্র ধরে বড় প্রকল্প নিলে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা জরুরি। স্প্যানিশ এফআইইএম মূলত স্পেন সরকারের একটি অর্থায়ন মাধ্যম। ঋণের ক্ষেত্রে এর সুদের হার তুলনামূলক অনেক বেশি। ফলে এই অনুদান নিলে পরে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতে হবে কি না, তা ভেবে দেখার সুপারিশ করেছে কমিশন। নমনীয় ঋণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ স্পেন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বৈদেশিক অনুদানের নিশ্চয়তা নিয়ে ইআরডি জানিয়েছে, স্পেন সরকার ইমেইলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু অনুদান বা অর্থায়ন চুক্তি এখনো সই হয়নি।
সভায় অংশ নেওয়া ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টিএপিপিতে পরামর্শক সেবার ভ্যাট ও ট্যাক্সের সংস্থান রাখা হয়নি। সওজের প্রতিনিধি বলেন, স্পেন সরকারের পক্ষ থেকে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ হবে। পরামর্শক সেবার সব ব্যয় বহন করবে দেশটির সরকার। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ না থাকলেও ভবিষ্যতে ভ্যাট-ট্যাক্স অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে টিএপিপি পুনর্গঠন করা হবে।
পুরো টাকা কেন বিদেশি পরামর্শকের হাতে যাবে, এই প্রশ্নে সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, টিএ প্রকল্প সাধারণত এমনই হয়। তাই ২১ কোটি টাকা পরামর্শকেরাই পুরোটা খরচ করবেন। এখানে দেশি পরামর্শকের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প হলে কিছু দেশি পরামর্শক থাকত। এখানে বাংলাদেশের নিজের এক টাকাও নেই। স্প্যানিশ পরামর্শক নিজেদের জ্ঞান দিয়ে একটি রিচ ডকুমেন্ট তৈরি করে দিয়ে যাবেন।
সওজ জানায়, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর পাঁচদোনা-ভাঙ্গা-ঘোড়াশাল মহাসড়কের (জেড-২০৪৭) ডাঙ্গা বাজার এলাকায় সেতুটি হলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে যাতায়াত সহজ হবে। গাজীপুর থেকে আসা যানবাহন এই সেতু ব্যবহার করে পাঁচদোনা-ডাঙ্গা-ঘোড়াশাল হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উঠে সহজে সিলেট যেতে পারবে।
নদীর বাম তীরে নরসিংদী, ডান তীরে নারায়ণগঞ্জ। দুই তীরের মধ্যে সংযোগ না থাকায় দুই শিল্পাঞ্চলের মধ্যে ভারী যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সেতুর অবস্থান, নদীর নাব্য ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘ স্প্যানের একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ দরকার বলে সওজ মনে করে। প্রকল্পের মূল কাজ সেতু ও অ্যাপ্রোচ সড়কের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং নকশা করা। পুনর্গঠিত টিএপিপিতে প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা বিশদভাবে তুলে ধরতে বৈঠকে একমত হওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রকল্প পুনর্গঠনের পর পরামর্শকের সংখ্যা ও ব্যয় কতটা কমে এবং স্পেনের সঙ্গে আলোচনায় ভবিষ্যৎ ঋণের শর্ত কী দাঁড়ায়।

