ঢাকার তিনটি বড় মেট্রোরেল প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে ভাবছে বাংলাদেশ। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি খতিয়ে দেখছে সরকার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ঋণের শর্ত নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের লক্ষ্য, মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর কারণে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ঋণ চাপ তৈরি না হওয়া।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে জরুরি আলোচনা চলছে। কারণ ঋণের কিস্তি বা ধাপভিত্তিক চুক্তি দেরি হলে নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি সুদ দিতে হতে পারে।
এদিকে মেট্রোরেল-৫ দক্ষিণ লাইন প্রকল্পের চূড়ান্ত ঋণ শর্ত নিয়ে আলোচনার জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাবে।
জাপানি ঋণের সুদ বেড়েছে কয়েক গুণ
২০১৯ সালে জাইকার সঙ্গে প্রাথমিক ঋণ চুক্তিতে সুদের হার ছিল মাত্র ০.৬ শতাংশ থেকে ০.৯ শতাংশের মধ্যে। তবে প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে অর্থায়ন হওয়ায় নতুন কিস্তির ক্ষেত্রে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদ নির্ধারিত হচ্ছে।
বর্তমানে জাইকার ঋণের নির্ধারিত সুদহার বেড়ে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে। অক্টোবর থেকে এটি আরও বেড়ে ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ হতে পারে।
এই সুদ বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে মেট্রোরেল-১ (বিমানবন্দর-কামালাপুর) এবং মেট্রোরেল-৫ উত্তর (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পে।
একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই দুই প্রকল্পের প্রাথমিক সম্মিলিত ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। সংশোধিত হিসাবে ব্যয় বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে জাপানের ঋণের অংশ দুই প্রকল্পে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
পরিবর্তনশীল সুদের ঋণের চিন্তা
তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে ইআরডি কর্মকর্তারা পরিবর্তনশীল সুদের ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন।
এ ক্ষেত্রে টোকিও টার্ম রিস্ক-ফ্রি রেট (টিওআরএফ) ভিত্তিক ঋণের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
৬ মাসের টিওআরএফ হার প্রায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ০.৪৫ শতাংশ যোগ করলে প্রাথমিক সুদহার প্রায় ১ দশমিক ৮০ শতাংশ হতে পারে।
অন্যদিকে ৩ মাসের টিওআরএফ হার ব্যবহার করলে প্রাথমিক সুদহার প্রায় ১ দশমিক ২০ শতাংশ হতে পারে।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, পরিবর্তনশীল সুদের ঋণে দীর্ঘ ৩০ বছরের পরিশোধ মেয়াদে আন্তর্জাতিক সুদহার বাড়লে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণেও পরিবর্তন
মেট্রোরেল-৫ দক্ষিণ প্রকল্পেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। গাবতলী-দাশেরকান্দি মেট্রোরেল প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার ১৩৫ কোটি ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২৩৬ কোটি ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ) থেকে প্রায় শূন্য সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এই ঋণের সুদহার ছিল ০.০১ শতাংশ থেকে ০.০৫ শতাংশ এবং পরিশোধের সময়সীমা ছিল ৪০ বছর।
তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া এখন এসব শর্ত পুনর্বিবেচনার কথা জানিয়েছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সুবিধার আওতায় ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে সুদহার ১ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় শুধু কম সুদ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার এবং প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনা করা জরুরি।

