বাজারের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা মাছের রুপালি আঁশ সাধারণ চোখে নিছক আবর্জনা মনে হলেও এটিই একদল মানুষের জীবিকার মূল ভরসা। মাছ কাটার পর সেই আঁশ সংগ্রহ, ধোয়া, শুকানো এবং সবশেষে বিক্রি—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া ঘিরেই টিকে আছে অনেক পরিবারের সংসার।
হাতবদল হতে হতে এই আঁশ পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন কারখানায়, এমনকি সাগর পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও, যেখানে তৈরি হয় মাছ-পোলট্রি খাদ্য থেকে শুরু করে প্রসাধনী ও ওষুধ শিল্পের নানা পণ্য।
তবে একসময় যে আঁশ কেজিপ্রতি ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতো, এখন তার দাম নেমে এসেছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়। কমেছে বিক্রির পরিমাণও। অথচ আঁশ সংগ্রহ থেকে শুকানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ পরিশ্রম আর অনিশ্চিত আয়ের সংগ্রাম।
সরকারি কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে মাছের আঁশ মূলত রফতানি হয় জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও সিঙ্গাপুরে। দেশে হাতে গোনা ১০-১২ জন ব্যবসায়ী সরাসরি এই রফতানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে আঁশ সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণে জড়িত রয়েছেন অসংখ্য মানুষ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রায় দুই দশক ধরে মাছ কাটা এবং আঁশ সংগ্রহের কাজ করছেন এক ব্যক্তি, যিনি এর আগে পেশায় ছিলেন ট্রাকচালক। তিনি জানান, নিজে মাছ কাটার পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকেও নিয়মিত মাসিক চুক্তিতে আঁশ কেনেন। যিনি যত বেশি আঁশ সরবরাহ করেন, তার পারিশ্রমিকও তত বেশি—কারও মাসে দুই হাজার, কারও আবার দশ হাজার টাকা পর্যন্ত।
তার ভাষ্যে, পুরো প্রক্রিয়াটি রীতিমতো পরিশ্রমসাধ্য। আঁশ প্রথমে ওজন করে ধুয়ে শুকাতে হয়, আর শুকানোর সময় বৃষ্টি এলে দৌড়ে তা সরিয়ে নিতে হয়, রোদ উঠলে আবার মেলে দিতে হয়—পুরো প্রক্রিয়ায় দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যায়। অথচ এত পরিশ্রমের পরও দাম কমে গিয়ে এখন আগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
আয় কমে যাওয়ায় তার মাসিক ব্যবসার পরিমাণও কমেছে ব্যাপকভাবে—আগে যেখানে মাসে আটশ থেকে নয়শ কেজি আঁশ বিক্রি হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র একশ থেকে দেড়শ কেজিতে। এই অবস্থায় সংসার চালাতে গিয়ে তিনি ইতিমধ্যে দুই লাখ টাকার বেশি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন এবং গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, যদিও হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেই সিদ্ধান্তও অনিশ্চিত।
একই এলাকায় রেললাইনের পাশে বসবাসকারী আরেকজন নারী নিজে ও ছেলের সঙ্গে মাছ কেটে সেখান থেকে পাওয়া আঁশ ধুয়ে-শুকিয়ে বিক্রি করেন। মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ কেজি আঁশ জমাতে পারেন তিনি, যা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে।
অনুরূপ কাজে যুক্ত আরেকজন নারী জানান, মাসে গড়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকার আঁশ বিক্রি করতে পারেন তিনি, যা আগে ছিল অনেক বেশি। দাম কমার সুনির্দিষ্ট কারণ তার জানা নেই, তবে শুনেছেন চীনের চাহিদা কমে যাওয়াই এর পেছনে বড় কারণ।
মাছের এই ফেলনা আঁশ থেকে বিশ্বজুড়ে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য মূল্যবান পণ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আঁশ থেকে আহরিত কোলাজেন ও জিলেটিন দিয়ে ওষুধ শিল্পে ক্যাপসুলের খোসা তৈরি হয়। গ্লাইসিন, প্রোলিনসহ গুরুত্বপূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিডসমৃদ্ধ হওয়ায় এর পাউডার স্যুপেও ব্যবহৃত হয়, আর কোলাজেন সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে কৃত্রিম কর্নিয়া ও কৃত্রিম হাড় তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে।
প্রসাধনী শিল্পে আঁশ থেকে পাওয়া একটি বিশেষ যৌগ ব্যবহৃত হয় লিপস্টিক ও নেইলপলিশ তৈরিতে, আবার এর নির্যাস দিয়ে তৈরি হয় কৃত্রিম মুক্তা ও বিভিন্ন গয়না। চীন-জাপানের মতো দেশে আরও উন্নত প্রযুক্তিতে এই আঁশ থেকে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরনের ন্যানো জেনারেটর, যা রিচার্জেবল ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন মাছের আঁশ রফতানি হয়ে আয় হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৯ কোটি টাকার সমান। অথচ তার আগের অর্থবছরে প্রায় চার হাজার টন আঁশ রফতানি করে আয় হয়েছিল প্রায় ৯০ লাখ ডলার বা প্রায় ১১০ কোটি টাকা—অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেই আয় কমেছে অর্ধেকেরও বেশি।
চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সাম্প্রতিক অর্থবছরে প্রায় ২০০ টন আঁশ রফতানি হয়ে আয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর এই আয়ের পরিমাণ ছিল পাঁচ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে ঢাকা থেকে সাম্প্রতিক বছরে প্রায় ১৯০০ টন আঁশ রফতানি হয়ে আয় হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় (প্রায় ৯৩ কোটি টাকা) অনেকটাই কম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা কেবল একটি পণ্যের বাজার সংকোচনের গল্প নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো প্রান্তিক মানুষের জীবিকার নিরাপত্তাহীনতাও। রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

