বিশ্বের ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরগুলোর তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানে এবারও পরিবর্তন আসেনি। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বেশি কনটেইনার সামলালেও বিশ্বের ১০০ ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরের মধ্যে ৬৮তম অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো একই অবস্থান ধরে রাখার বিষয়টি একদিকে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।
লন্ডনভিত্তিক নৌপরিবহনবিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্ট সম্প্রতি ‘লয়েডস লিস্ট: ওয়ান হান্ড্রেড পোর্টস ২০২৬’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনে বিশ্বের ১০০ ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরের তালিকা প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে কত পরিমাণ কনটেইনার ওঠানামা করেছে, মূলত সেই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ বন্দরের সেবার মান, দক্ষতা কিংবা সামগ্রিক কর্মদক্ষতা দিয়ে এই অবস্থান নির্ধারণ করা হয়নি।
তবু কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণকে একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। কারণ শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে উচ্চমূল্যের আমদানি ও রপ্তানি পণ্য—বাণিজ্যের বড় একটি অংশই সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে চলাচল করে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতিরও একটি ধারণা দেয়।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক কনটেইনার সামলেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার একক। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
সংখ্যার দিক থেকে এই বৃদ্ধি ছোট নয়। কিন্তু বিশ্বব্যাপী অন্য বন্দরগুলোর সক্ষমতা ও কনটেইনার পরিবহনের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, শুধু পরিমাণ বাড়লেই আন্তর্জাতিক তালিকায় অবস্থান উন্নত করা সম্ভব হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর ৬৮তম অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে, কিন্তু গত এক দশকে যে অবস্থানে একবার পৌঁছেছিল, সেখানে এখনও ফিরতে পারেনি।
একসময় ৫৮তম অবস্থানেও ছিল চট্টগ্রাম
বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের উপস্থিতি নতুন নয়। ২০০৯ সাল থেকেই বন্দরটি এই তালিকায় রয়েছে। গত এক দশকে এর সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ৫৮তম।
২০১৯ সালের কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণের ভিত্তিতে ২০২০ সালে প্রকাশিত তালিকায় চট্টগ্রাম ৫৮তম অবস্থান অর্জন করেছিল। এরপর বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই অবস্থান আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এখানেই চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম বাড়ছে, কিন্তু একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য বড় বন্দরও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে শুধু নিজেদের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগোতে হলে সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি আরও বাড়াতে হবে।
বিশ্বে চীনের আধিপত্য
বিশ্বের কনটেইনার বন্দরগুলোর শীর্ষ তালিকায় ২০২৫ সালেও চীনের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। সাংহাই বন্দর ৫ কোটি ৫০ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন করে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত কনটেইনার বন্দর হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এক বছরে বন্দরটির কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
৪ কোটি ৪৭ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর।
শীর্ষ ১০ বন্দরের মধ্যে ছয়টিই চীনে অবস্থিত। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরে মোট ৭৯ কোটি ২২ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। এর মধ্যে চীনের বন্দরগুলো একাই ৪০ শতাংশের বেশি কনটেইনার সামলেছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের সম্মিলিত কনটেইনার পরিবহন আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
এই পরিসংখ্যান চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে থাকা প্রতিযোগিতার মাত্রাটিও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশের প্রধান বন্দরটি যেখানে ৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, সেখানে বিশ্বের শীর্ষ বন্দরগুলোর অনেকগুলো আরও দ্রুত গতিতে তাদের কার্যক্রম বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বড় অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে দেশের বাইরে যায় বা দেশে আসে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক মনে করেন, বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়ছে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটানো এবং বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার সেবার মান উন্নত করা গেলে এই প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানো সম্ভব।
অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বন্দরের সক্ষমতা যদি আমদানি-রপ্তানির প্রবৃদ্ধির তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ে, তাহলে একসময় পণ্য খালাস ও পরিবহনে বাড়তি সময় লাগতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসার খরচেও। বিপরীতে দ্রুত ও কার্যকর বন্দর ব্যবস্থা থাকলে পণ্য পরিবহনের সময় কমে, সরবরাহব্যবস্থা আরও গতিশীল হয় এবং ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়ে।
নতুন বিনিয়োগে বদলানোর সম্ভাবনা
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার জায়গাও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে।
নতুন টার্মিনালগুলো চালু হলে বন্দরের কনটেইনার সামলানোর সামগ্রিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এতে বর্তমান চাপ কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাড়তি বাণিজ্য সামলানোর সুযোগও তৈরি হবে।
এখানে বিনিয়োগের বিষয়টি শুধু নতুন স্থাপনা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি, দ্রুত পণ্য খালাস, উন্নত ব্যবস্থাপনা, শুল্ক কার্যক্রমের দক্ষতা এবং বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সমন্বিত ব্যবস্থা—সবকিছু একসঙ্গে উন্নত করতে হবে।
কারণ একটি বন্দরের সক্ষমতা কেবল জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। বন্দরের ভেতরের কার্যক্রম থেকে শুরু করে শুল্ক প্রক্রিয়া এবং সড়ক ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ—পুরো ব্যবস্থাটিই কার্যকর হতে হয়।
৬৮তম অবস্থান কি খারাপ খবর?
শুধু অবস্থানের সংখ্যা দেখলে চট্টগ্রাম বন্দরের ৬৮তম স্থানকে খুব বড় সাফল্য বা ব্যর্থতা—কোনোটিই বলা যায় না। বরং পুরো চিত্রটি দেখলে বোঝা যায়, বন্দরটি তার কার্যক্রম বাড়াচ্ছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান উন্নত করার মতো দ্রুত গতিতে সেই সক্ষমতা বাড়ছে না।
এক বছরে ৪ দশমিক ১ শতাংশ কনটেইনার প্রবৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহন যখন ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, তখন চট্টগ্রামের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায় এর ওপর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় চাপ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়লে বন্দরের ওপর চাপও বাড়বে।
এই বাস্তবতায় ৬৮তম অবস্থান ধরে রাখাকে শেষ সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে পরবর্তী সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি পর্যায় হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ সক্ষমতা ও দক্ষতা
চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো—কীভাবে কনটেইনার পরিবহনের প্রবৃদ্ধিকে আরও দ্রুত করা যায় এবং একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমানো যায়।
নতুন টার্মিনাল চালু হলে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু সেই সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দক্ষ ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা, শুল্ক কার্যক্রমে গতি, পণ্য খালাসে সময় কমানো এবং বন্দরের সঙ্গে অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে এগোতে হবে।
কারণ আন্তর্জাতিক বন্দর প্রতিযোগিতায় শুধু কত কনটেইনার সামলানো হচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কত দ্রুত, কত কম খরচে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে সেই কাজ করা যাচ্ছে, সেটিও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বন্দরের ৬৮তম অবস্থান তাই একই সঙ্গে সাফল্য ও সতর্কবার্তা। সাফল্য এই কারণে যে বন্দরটি টানা দ্বিতীয় বছর বিশ্বের ১০০ ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরের মধ্যে রয়েছে এবং ২০২৫ সালে কনটেইনার পরিবহন ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। আবার সতর্কবার্তা হলো, একসময় ৫৮তম অবস্থানে থাকা বন্দরটি এখনও সেই জায়গায় ফিরতে পারেনি।
নতুন বিনিয়োগ ও টার্মিনাল নির্মাণের সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে এই চিত্র বদলানো সম্ভব। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য যত বাড়বে, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর প্রত্যাশাও তত বাড়বে। তাই এখন লক্ষ্য শুধু বিশ্বসেরা ১০০ বন্দরের তালিকায় থাকা নয়; বরং সেই তালিকায় আরও ওপরে ওঠার মতো সক্ষমতা তৈরি করা।

